লক্ষ্যভেদে হয় না কোনও ‘রবিবার’! মোবাইল থেকে ইউটিউব মুছে এশিয়াডে সোনার তির সপ্তদশী কুমকুমের

উৎসব বা ছুটি নেই। এমনকি ডিলিট করেছেন ইউটিউবও! এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী ১৭ বছরের কুমকুম মোহদের অবিশ্বাস্য সাফল্যের নেপথ্য কাহিনি।

Oct 08, 2026 - 16:09
0 0

এশিয়ান গেমসের (Asian Games 2026) ফাইনালে তখন টানটান উত্তেজনা। সামনে শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়ার ও ইয়েজিন। পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন। ম্যাচ গড়িয়েছে শুট-অফে। লক্ষ্য একটাই—নিখুঁত তির ছোড়া, যা ভারতের রিকার্ভ আর্চারির ইতিহাসে আগে কখনও হয়নি।

স্নায়ুর চাপ সামলে ইয়েজিন মারলেন ৮, আর কুমকুম অনিল মোহদের তির সরাসরি গিয়ে বিঁধল ১০-এর ঘরে!

শনিবার এভাবেই আইচি-নাগোয়াতে মেয়েদের ব্যক্তিগত রিকার্ভ আর্চারিতে ঐতিহাসিক সোনা জিতে নতুন ইতিহাস লিখলেন মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর ১৭ বছরের কিশোরী।

এক আসরে তিন পদক ও অলিম্পিক কোটা

এশিয়াডে এটাই কুমকুমের অভিষেক। আর প্রথম আসরে বাজিমাত! দলগত ইভেন্টে সোনা, মিক্সড টিমে রুপো, এবং অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত ব্যক্তিগত ইভেন্টেও গোল্ড মেডেল। এই প্রথম কোনও ভারতীয় মহিলা রিকার্ভ আর্চারিতে এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক জিতলেন। শুধু তাই নয়, এই জয়ের সুবাদে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের কোটাও নিশ্চিত করল ভারত।

কুমকুমের অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক জেদি কিশোরীর অমানুষিক আত্মত্যাগ। কোচ প্রফুল্ল ডাঙ্গের কথায়, 'আমি যখন রবিবার ছুটি দিতাম, ও বলত, না স্যার, আমি অন্তত একবার প্র্যাকটিস করতে যাব। আমি বোঝাতাম, যে পেশির বিশ্রাম দরকার, চোট লেগে যাবে। কিন্তু ওকে আটকানো মুশকিল।' কুমকুমের কাছে প্র্যাকটিসই সব। দীপাবলির মতো উৎসবের দিনেও প্রথম অগ্রাধিকার আর্চারি! 

ইউটিউব ডিলিট, ফোকাস শুধু লক্ষ্যে

আর্চারি, দিনের শেষে, একটি মানসিক খেলা। যে কারণে কোচ প্রফুল্ল কুমকুমকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু কুমকুম সেই নিদানকে নিয়ে যান অন্য মাত্রায়। প্রফুল্লর কথায়, 'ও এখন জাপানে আছে, কিন্তু গত এক মাস ধরে নিজের ফোন থেকে ইউটিউব ডিলিট করে দিয়েছে। আমি এটা করতে বলিনি। কুমকুম নিজে থেকেই করেছে। এতেই বোঝা যায় ওর ফোকাস কোন স্তরে।'

সংগ্রামের শুরু আর অদম্য জেদ

সাফল্যের রাস্তাটা মোটেই মসৃণ ছিল না। কুমকুমের বাবা অনিল মনোহর মোহদ অমরাবতীতে মিষ্টির দোকানের কার্ডবোর্ড-বাক্স বানান। ২০১৮ সালে প্রফুল্ল ডাঙ্গের রাধে আর্চারি ট্রেনিং সেন্টারে মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। প্রথম দিকে একটা সাধারণ কাঠের ধনুক দিয়ে প্র্যাকটিস শুরু। পরে সেকেন্ড-হ্যান্ড রিকার্ভ ধনুক জোটে। কুমকুমের কাঁধের জোর দেখেই কোচ তাঁকে রিকার্ভে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। ৫-৬ মাস ধরে শুধু কাছ থেকে তির ছোড়ার একঘেয়ে প্র্যাকটিস। কোনও অভিযোগ ছাড়াই কুমকুম সেই রুটিন মেনে চলেছেন। দৌড়নো, পুশ-আপ—ফিজিক্যাল ফিটনেসের জন্য সব কিছু করেছেন হাসিমুখে।

জাপানের মাটিতে কোরিয়ান-বধ

কুমকুমের মানসিক জোরের প্রমাণ মিলেছে জাপানেও। কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি হারান টোকিও অলিম্পিকের দলগত সোনাজয়ী এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ কোরিয়ার ক্যাং চেইয়ংকে। সেমিফাইনালে পরাজিত করেন চিনের ঝু জিংয়িকে। আর ফাইনালে ও ইয়েজিন। প্রথম সেটে পিছিয়ে পড়ার পর, তৃতীয় ও পঞ্চম সেটে নিখুঁত ৩০ মেরে ম্যাচ ৫-৫ করেন। তারপর সেই স্বপ্নের শুট-অফ!

অমরাবতীর ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অফিসার গণেশ যাদব। তাঁর বার্তা, 'কুমকুম যদি অলিম্পিক থেকে পদক আনে, তবে অমরাবতী আর্চারি রেঞ্জের নাম ওর নামেই রাখা হবে।' যদিও এসব অনেক দূরের গল্প। আপাতত এই শান্ত, সমাহিত সপ্তদশীর পাখির চোখ আরও কঠোর প্র্যাকটিস। তাঁর কাছে রবিবার বলে যে কোনও ছুটির দিন নেই!

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User