Premature Birth: সময়ের আগেই কোল আলো করে আসছে সন্তান, কারণ কি শুধু জীবনযাপন নাকি নেপথ্যে দাঁতের লুকনো রোগ?

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সোমা হালদার বলেন, সময়ের আগে জন্মানোর (Pre-term birth) ফলে বাচ্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুতর ও প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রি-টার্ম বাচ্চার মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিংবা তাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল ইনফেকশন বাসা বাঁধতে পারে।

Sep 22, 2026 - 19:23
0 0

এপ্রসঙ্গে সম্প্রতি মা হয়েছেন দীপিকা, তাঁরও কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে, সময়ের আগেই হয়ে গেছে ডেলিভারী! টলিউডের সোহিনীর কোলেও এল পুত্র সন্তান। সেটা সময়ের বেশকিছুদিন আগে। তারকা থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে মালিনী, সোমা, শ্রেয়া কিংবা তিয়া— সবার ক্ষেত্রেই প্রায় এখন সময়ের আগে ডেলিভারী হতে দেখা যাচ্ছে। আধুনিক ব্যস্ততা, জীবনযাত্রার বদল কিংবা মানসিক চাপ — প্রিম্যাচিওর বার্থ বা অকাল জন্মহার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নানা বিষয় সামনে আসে। কিন্তু বর্তমান সমীক্ষা ও চিকিৎসকদের গবেষণা বলছে, এই উদ্বেগের নেপথ্যে রয়েছে আরও এক মারাত্মক ও লুকনো কারণ, আর তা হল দাঁতের রোগ বা পাইরিয়া (পিরিওডোনটাইটিস)!

কিং জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তথা গবেষক ডা. অঞ্জনি পাঠকের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দাঁতের বা মাড়ির এই ইনফেকশন কেবল মুখের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পৌঁছে যেতে পারে সরাসরি প্লাসেন্টায়। আর এর থেকেই ডেকে আনতে পারে প্রিম্যাচিওর লেবার বা সময়ের আগে প্রসবের মতো মারাত্মক ঝুঁকি। চিকিৎসকদের মতে, মাড়ির রোগ থাকলে গর্ভস্থ শিশুর অকাল জন্ম বা প্রিম্যাচিওর বার্থের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই মাড়ি অনেক বেশি সংবেদনশীল ও দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে পাইরিয়ার মতো ইনফেকশনকে অবহেলা করলে বিপদ আরও দ্রুত ঘনীভূত হয়।

এরাজ্যের  চিকিৎসকদের মতে প্রি-টার্ম বার্থ কেন অত্যন্ত বিপজ্জনক?

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সোমা হালদার বলেন, সময়ের আগে জন্মানোর (Pre-term birth) ফলে বাচ্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুতর ও প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রি-টার্ম বাচ্চার মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিংবা তাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল ইনফেকশন বাসা বাঁধতে পারে। চিকিৎসাগত দিক থেকে দেখলে, প্রি-টার্ম বার্থ একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয় এবং অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকা এবং সাউথ-ইস্ট এশিয়ার গর্ভবতীদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব ও ঝুঁকি অনেক বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। যার একাধিক কারণের মধ্যে ডেন্টাল ইনফেকশন বা পিরিওডোনটাইটিস অন্যতম কারণ।  

দাঁতের ইনফেকশন থেকে গর্ভাবস্থায় কী কী প্রভাব? 

•    রক্তপ্রবাহে ব্যাকটেরিয়া: ইনফেকশনের কারণে ফুলে থাকা ও রক্তপাত হওয়া মাড়ি অনেকটা খোলা ক্ষতের মতো কাজ করে। মুখের ভেতরের এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া রক্তের সঙ্গে মিশে সরাসরি প্লাসেন্টায় পৌঁছে যায়।

•    প্রিম্যাচিওর বার্থ: এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ফলে শরীর প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন এবং সাইটোকাইনের মতো ইনফ্ল্যামেটরি পদার্থ তৈরি করে। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা শরীরকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসবের সংকেত দেয়, যা ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রিটার্ম বার্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

•    হরমোনজনিত সমস্যা: গর্ভাবস্থার হরমোন মাড়িকে অনেক বেশি সংবেদনশীল, ফোলা এবং রক্তপাতপ্রবণ করে তোলে (জিঞ্জিভাইটিস বা পিরিওডোনটাইটিসের অবনতি ঘটিয়ে)। এর ফলে সামান্য অবহেলাতেও ডেন্টাল সমস্যা দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করে।

পিরিওডোনটাইটিস ও তা থেকে  কুপ্রভাব

কেন গর্ভাবস্থায় দাঁতের সমস্যা ঝুঁকি ডেকে আনে, তা নিয়ে সতর্ক করতে গিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের প্রধান ডাঃ সোমা হালদার বলেন, পিরিওডোনটাইটিস বা মাড়ির এই মারাত্মক রোগ আসলে মুখের ভেতরের এমন একটি প্রদাহ যা শুধু দাঁতের ক্ষতি করেই থেমে থাকে না। আমাদের মুখের ভেতরে প্রায় ৫০০-র বেশি প্রজাতির ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধতে পারে। মাড়ির এই ইনফেকশন যখন রক্তে মিশে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা হৃৎপিণ্ড, হরমোনতন্ত্র থেকে শুরু করে প্রজনন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মাড়ি ফুলে গেলে শরীর থেকে কিছু ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়, যা গর্ভের সন্তানের ওপর সরাসরি আঘাত হানতে পারে। গবেষকদের মতে, দাঁতের এই লুকনো রোগটিই অনেক সময় গর্ভস্থ শিশুর ওজন কমিয়ে দেওয়া বা নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসবের মতো বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নবজাতকের ওপরও মারাত্মক ঝুঁকি 

সময়ের আগে প্রসবের কারণে নবজাতকদের মধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন: জন্মের সময় ওজন কম হওয়া (২,৫০০ গ্রামের কম), শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসের জটিলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া।

তাহলে কী করণীয়?

•    ওরাল হাইজিন ঠিক রাখা: ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দিনে দু'বার দাঁত ব্রাশ করতে হবে এবং নিয়মিত ফ্লস করতে হবে।

•    রুটিন ডেন্টাল চেকআপ: গর্ভাবস্থায় ডেনটিস্টের পরামর্শ সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং জরুরি। প্রথম অবস্থাতেই মাড়ির প্রদাহের চিকিৎসা করালে গর্ভাবস্থার অনেক বড় ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

অন্যান্য টেস্টের মতো জরুরি দাঁতের পরীক্ষাও

গর্ভধারণের আগে প্রতিটি হবু মায়েরই ওরাল বা মুখের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি,"— এমনটাই জানালেন ডাঃ হালদার।

অনেক মহিলাই বাচ্চা নেওয়ার পরিকল্পনা করার আগেই খেয়াল করেন না যে তাঁদের দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা ব্যথা করার মতো সমস্যা রয়েছে কি না। চিকিৎসকদের মতে, দাঁতের এই ধরনের ইনফেকশনের প্রবণতা বা বারবার রক্ত পড়ার সমস্যা যদি আগে থেকেই থাকে, তবে তা অবহেলা করা একদমই উচিত নয়।

গর্ভধারণের পর চিকিৎসকদের পক্ষে চিকিৎসা করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন— গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে (First Trimester) কোনও রকম বড় ডেন্টাল চিকিৎসা বা সার্জারি করতে পারা যায় না, কারণ এতে বাচ্চার মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার বা মিসক্যারেজের ঝুঁকি থাকে। একইভাবে, গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসেও (Last Trimester) কোনও বড় বা ভারী চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না, কারণ এতে সময়ের আগেই প্রি-টার্ম লেবার বা প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এই কারণেই গর্ভধারণের ঠিক আগের সময়টা বা প্ল্যানিংয়ের পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন রক্তে থ্যালাসেমিয়া বা অন্য কোনও রোগ আছে কি না তা জানতে মহিলারা বিভিন্ন ব্লাড টেস্ট বা রুটিন পরীক্ষা করান, তেমনই মাড়ির কোনও ইনফেকশন বা পাইরিয়ার সমস্যা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখে সম্পূর্ণ চিকিৎসা করিয়ে নেওয়া উচিত। হবু মায়ের যদি মাড়ি সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ থাকে  তবেই গর্ভধারণের কথা ভাবলে অকাল প্রসবের মতো অনেক বড় ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

গর্ভাবস্থার মাঝের তিন মাস অর্থাৎ দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে কিছু সীমিত চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও তা হতে হবে অত্যন্ত সতর্কতামূলক। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, এই সময়ে শুধুমাত্র খুবই 'নন-ইনভেসিভ' (Non-invasive) বা অল্পস্বল্প চিকিৎসা করা যেতে পারে—যেখানে খুব বেশি রক্তপাত বা ভারী ওষুধ কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। তাই মাড়ির কোনও লুকনো রোগ বা ইনফেকশন থাকলে তা প্রেগন্যান্সির আগেই সারিয়ে তোলা একজন হবু মায়ের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User