কার্লসেনকে হারিয়ে সটান ঘুম! বিশ্বচ্যাম্পিয়নের দর্পচূর্ণ করেও নির্বিকার দিল্লির কিশোর
১৫ বছরের এক দিল্লির কিশোর অনলাইনে হারিয়ে দিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ম্যাগনাস কার্লসেনকে! আর তারপর কাউকে না জানিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়েও পড়ল! জানুন অদ্ভুত এই দাবাড়ুর গল্প।
বিশ্বের এক নম্বর দাবাড়ুকে হারিয়ে দেওয়াটা যে কারও কাছে স্বপ্নের মতো। কেউ আনন্দে লাফায়, কেউ উৎসব করে। কিন্তু দিল্লির পনেরো বছরের কিশোর বন্দন অলঙ্কার সাওয়াই হাঁটল সম্পূর্ণ উল্টো পথে। অনলাইনে ম্যাগনাস কার্লসেনকে (Magnus Carlsen) হারিয়ে তার কোনও হেলদোলই নেই! স্রেফ চারটে ম্যাচ খেলে, ক্লান্ত হয়ে সটান ঘুমিয়ে পড়ল সে। বাড়ির কাউকে বা কোচকে কিছু বলার প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না! পরের দিন বাবা অনলাইনে ঘাঁটতে গিয়ে দেখলেন, তাঁর গুণধর ছেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের দর্পচূর্ণ করেছে।
মা-বাবার জোরাজুরিতেই বাজিমাত
গত ১৮ অগস্ট চেস.কম-এর (Chess.com) 'টাইটেলড টুয়েসডে' ব্লিটজ টুর্নামেন্ট সাক্ষী থাকল এই অঘটনের। বন্দনের ফিডে ক্লাসিক্যাল রেটিং ২২৮৮। অন্যদিকে কার্লসেনের ২৮২৩। রেটিংয়ের এই আকাশপাতাল তফাত বিন্দুমাত্র ছাপ ফেলেনি কিশোরের মনে।
মজার ব্যাপার, এই টুর্নামেন্ট নাকি গোড়াতে খেলতেই চায়নি বন্দন। তার মা ডঃ মাধুরী অলঙ্কার সাওয়াই বলেন, 'আমি আর আমার স্বামী বাড়িতেই ছিলাম। ও এসে বলল টুর্নামেন্ট খেলেছে। ওর বাবা জোর করায় তখন জানায়, যে কার্লসেনের বিরুদ্ধে খেলে জিতেছে। বন্দন তো খেলতেই চাইছিল না। আমরাই জোর করে খেলতে পাঠিয়েছিলাম।' বন্দনের কোচ গুরপ্রীত পাল সিং-ও এই জয়ের খবর জানতে পারেন পরের দিন (Chess News)।
সাদা ঘুঁটির দাপট ও কার্লসেনের ব্লান্ডার
ম্যাচটি ছিল পাঁচ মিনিটের। দ্বিতীয় রাউন্ডেই কার্লসেনের সামনে পড়ে যায় বন্দন। তবে ঘাবড়ে যাওয়ার পাত্র সে নয়। নিজের চিরাচরিত 'e4' চাল দিয়ে খেলা শুরু করে (Chess Tournament)। কার্লসেন 'e5' দিয়ে জবাব দিলে খেলা গড়ায় 'গিউকো পিয়ানো' ওপেনিংয়ে। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে নিখুঁত তাল মিলিয়ে চাপ বাড়াতে থাকে দিল্লির কিশোর। বন্দনের বিশপের মারাত্মক চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েন কার্লসেন। বাধ্য হয়েই নিজের ঘুঁটি খোয়ান নরওয়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। বন্দনের কথায়, 'ও যখন এরকম একটা ভুল চাল দিল, আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার হারানোর কিছু ছিল না, পাওয়ার ছিল অনেক কিছু। তাই সাদা ঘুঁটি নিয়ে আরামদায়ক গেম খেলব ভেবেছিলাম।'
পঞ্চাশ নম্বর চালে বাধ্য হয়ে হার স্বীকার করেন কার্লসেন। তবে এই মহাবিজয়ের পরেও বন্দনের কোনও উৎসব ছিল না। নির্লিপ্তভাবে সে আরও দুটি ম্যাচ খেলে। চার ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জিতে এবং একটিতে হেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোজা ঘুমোতে চলে যায়।
দাবা নয়, আগ্রহ ইতিহাস-বিজ্ঞানে
সাত বছর ধরে বন্দনকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন গুরপ্রীত। তাঁর মতে, বোর্ডে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক হলেও এমনিতে ছেলেটি খুবই শান্ত ও মিতভাষী (Indian Chess Player)। ছোটবেলায় মায়ের কাছেই দাবার হাতেখড়ি তার। মা মাধুরী আগে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে দাবা খেলতেন। সেখান থেকেই ছেলের আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি বলেন, 'ও খুব তাড়াতাড়ি খেলাটা শিখে নেয়। এক বা দুই চালের কিস্তিমাতের পাজলগুলো নিমেষে সমাধান করে ফেলত।'
তবে শুধু দাবার ঘুঁটি নয়, বন্দনের জগৎ আরও বিস্তৃত। সে পড়াশোনায় দারুণ তুখোড়। সিনেমা বা গল্পবইয়ের বদলে যুদ্ধের ইতিহাস পড়তেই বেশি ভালোবাসে। ভবিষ্যতে দাবাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার বিষয়েও সে নিশ্চিত নয়। আপাতত ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে বন্দন। তার সাফ কথা, 'ভবিষ্যতে দাবা আমার পুরো সময়ের পেশা হবে কি না, জানি না। কারণ এই বয়সেই অনেকে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যাচ্ছে। হয়তো ইতিহাস বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়েই পড়াশোনা করব।' কার্লসেনকে হারানোর গল্প নিয়ে যখন মাসের পর মাস আড্ডা দেওয়া যায়, তখন দিল্লির এই কিশোর যেন এক অন্য গ্রহের বাসিন্দা! নীরবে কাজ হাসিল করেই সে খুশি।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)