গরুর প্রস্রাব থেকে তৈরি হত গাঢ় হলুদ রং, ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন ভ্যান গগ, জড়িয়ে বাংলার নাম!

'ইন্ডিয়ান ইয়েলো' এবং 'বেঙ্গল লাইট'-এর মূল উৎস ছিল ভারতের গবাদি পশুর প্রস্রাব! গবেষকদের সৌজন্যে ফের সামনে এল ঔপনিবেশিক ভারতের এই ইতিহাস।

Aug 05, 2026 - 19:48
0 0
গরুর প্রস্রাব থেকে তৈরি হত গাঢ় হলুদ রং, ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন ভ্যান গগ, জড়িয়ে বাংলার নাম!

আজকের সমকালীন শিল্পে প্রস্রাব, রক্ত বা শরীরজাত বর্জ্যকে শিল্পের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, প্রায় দু'শো বছর আগেই ভারতের মাটিতে এমন এক শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল, যার কেন্দ্রেই ছিল গরুর প্রস্রাব। শুধু চিত্রকলা নয়, প্রাথমিক আলোকচিত্র প্রযুক্তিও নির্ভর করেছিল সেই উপাদানের উপর। ঔপনিবেশিক ভারতের এই বিস্মৃত অধ্যায় ফের সামনে এল নতুন গবেষণা সূত্রে।

এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে দু'টি নাম—ইন্ডিয়ান ইয়েলো এবং বেঙ্গল লাইট।

ইন্ডিয়ান ইয়েলো ছিল বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হলুদ রঞ্জক। ষোড়শ থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত মুঘল, রাজস্থানি ও পাহাড়ি মিনিয়েচার চিত্রকলায় এই রঙের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। অষ্টাদশ শতকের শেষে এটি ইউরোপে পৌঁছয়। পরে ব্রিটেনের বিখ্যাত রঙ প্রস্তুতকারক সংস্থা উইন্সর অ্যান্ড নিউটনের ক্যাটালগেও জায়গা পায়। শিল্প ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের 'স্টারি নাইটে'র দীপ্তিমান হলুদেও এই রঞ্জকের ব্যবহার হয়েছিল বলে জানা যায়।

তবে এই রঙের উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন রহস্য ছিল। কোথা থেকে এত উজ্জ্বল রঙ পাওয়া যাচ্ছে, সে নিয়ে কৌতুহলের শেষ ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৩ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক আধিকারিক টি. এন. মুখার্জি বিহারের মুঙ্গেরে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি নথিবদ্ধ করেন। সেখানে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের দুগ্ধচাষীরা কেবল আমপাতা ও জল খাওয়ানো গরুর উজ্জ্বল হলুদ প্রস্রাব সংগ্রহ করতেন। সেই তরল থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে কঠিন দানা তৈরি করে শুকিয়ে রফতানি করা হত লন্ডনে। বহু বছর ধরে এই বিবরণ নিয়ে সংশয় থাকলেও ২০১৯ সালে কিউ গার্ডেনে সংরক্ষিত নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষায় গরুর প্রস্রাবের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। প্রায় একশো বছর পর সত্য প্রমাণিত হয় মুখার্জির পর্যবেক্ষণ।

এই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বেঙ্গল লাইট। আধুনিক ফ্ল্যাশ আবিষ্কারের আগে আলোকচিত্রে কৃত্রিম আলো তৈরিতে ব্যবহৃত হত এই বিশেষ রাসায়নিক। এর মূল উপাদান ছিল সল্টপিটার বা পটাশিয়াম নাইট্রেট। বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গবাদি পশুর প্রস্রাবে সমৃদ্ধ মাটি থেকে এই সল্টপিটার সংগ্রহ করতেন নুনিয়া সম্প্রদায়ের শ্রমিকেরা।

পরে তা বিশুদ্ধ করে ইউরোপে পাঠানো হত। প্রথমে গানপাউডার তৈরিতে ব্যবহৃত হলেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ফোটোগ্রাফি ও আলোকসজ্জাতেও এর ব্যবহার শুরু হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের তীব্র নীলাভ আলো সেই সময় প্রতিকৃতি তোলার অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠে।

শিল্প, বিজ্ঞান এবং উপনিবেশ—তিনটির যোগসূত্র এখানেই স্পষ্ট। ভারতীয় কাঁচামাল, স্থানীয় শ্রম এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ব্যবহার করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল এক বিশাল বাণিজ্যিক শৃঙ্খল। ভারত থেকে সংগৃহীত উপাদান ইউরোপের শিল্পী, আলোকচিত্রী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছে তৈরি করেছিল নতুন নন্দনতত্ত্ব, অথচ সেই উৎসের কথা ইতিহাসে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল।

বিশ শতকের শুরুতে ছবিটা বদলে যায়। গরু রক্ষার আন্দোলন, ঔপনিবেশিক রাজনীতির টানাপড়েন এবং কৃত্রিম রাসায়নিকের আবিষ্কারের ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় ইন্ডিয়ান ইয়েলোর উৎপাদন। একই সময়ে শিল্পে ব্যবহৃত সল্টপিটারও কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হতে শুরু করে। ফলে হারিয়ে যেতে থাকে ভারতের একদম নিজস্ব সেই প্রযুক্তি।

তবু ইতিহাস পুরোপুরি মুছে যায়নি। জয়পুরের সপ্তম প্রজন্মের মিনিয়েচার শিল্পী শাম্মি বান্নু শর্মার কাছে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে আসল 'গোগোলি' বা ইন্ডিয়ান ইয়েলোর অতি সামান্য নমুনা। কৃষ্ণের অলংকার বা কপালে তিনি এখনও সেই রঙের স্পর্শ দেন অত্যন্ত সংযতভাবে। কয়েক গ্রাম রঞ্জকই তাঁর কাছে এক শিল্পঐতিহ্যের শেষ সাক্ষী।

আজ যখন পরিবেশ, ঐতিহ্য ও উপনিবেশের ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়নের মুখে, তখন ইন্ডিয়ান ইয়েলো এবং বেঙ্গল লাইটের গল্প মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বশিল্পের বহু উজ্জ্বল রঙের উৎস লুকিয়ে ছিল ভারতের গ্রাম, গবাদি পশু এবং সাধারণ মানুষের শ্রমে। সেই আলোয় সাম্রাজ্য উজ্জ্বল হয়েছিল, অথচ ইতিহাসে দীর্ঘদিন অন্ধকারেই থেকে গিয়েছিল তাদের অবদান।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User