মোদীর পিএম কেয়ারে কত টাকা? বড় অংশই ফিক্সড ডিপোজিটে, শুধু সুদই এসেছে ৪৭৫ কোটি টাকা
লাইভ মিন্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তহবিলের মোট পরিমাণ নয়, নজর কেড়েছে টাকা কোথায় রাখা হয়েছে সেই হিসাবও।
আজন্ম কাল থেকে প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল নামে একটি ফান্ড রয়েছে। তাও কোভিডের সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকার পিএম কেয়ার ফান্ড নামে একটি তহবিল তৈরি করে, যা নিয়ে বিতর্ক আজও পিছু ছাড়েনি। এ ব্যাপারে আকছার প্রশ্ন তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বাকি বিরোধীরা।
এত দিনে স্পষ্ট হল, সেই তহবিল তথা পিএম কেয়ার ফান্ড (PM CARES Fund) ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮,৪৫২.০৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবর্ষের শেষে এই তহবিলের পরিমাণ ছিল ৭,১৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে তহবিলের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১,২৭৯ কোটি টাকা।
লাইভ মিন্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তহবিলের মোট পরিমাণ নয়, নজর কেড়েছে টাকা কোথায় রাখা হয়েছে সেই হিসাবও। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শেষে PM CARES Fund-এর প্রায় ৬,৬৪১ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা ছিল। আগের বছর এই খাতে ছিল মাত্র ৭৮.৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা অর্থে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে।
এক বছরে ফিক্সড ডিপোজিটে বিপুল বৃদ্ধি
অডিটেড রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে PM CARES Fund-এর ফিক্সড ডিপোজিটের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৮.৪৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫-এর শেষে সেটিই বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬,৬৪১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা অর্থও আগের তুলনায় কমেছে। ২০২২-২৩ আর্থিক বছরেও পিএম কেয়ার ফান্ডের ৬২৮৩ কোটি টাকা সেভিংস অ্যাকাউন্টে ছিল। পরের আর্থিক বছরে তা কমে ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে হয়েছে ৬০৫ কোটি টাকা। ফলে তহবিলের বড় অংশই এখন ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা হয়েছে। এই পরিবর্তনটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আগের বছরগুলিতে তহবিলের সিংহভাগ সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছিল।
সুদ থেকেই এসেছে প্রায় ৪৭৫ কোটি টাকা
ফিক্সড ডিপোজিটে বিপুল অর্থ রাখার ফলে তহবিলের সুদ বাবদ আয়ও উল্লেখযোগ্য হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ফিক্সড ডিপোজিট থেকে প্রায় ৪৭৫ কোটি টাকা সুদ পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ নতুন করে কোনও অনুদান না এলেও তহবিলের একটি বড় অংশ সুদের মাধ্যমে বাড়তে থেকেছে। এছাড়াও ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের উপর কাটা উৎস্যমূলে করের প্রায় ১৩.৪৯ লক্ষ টাকা ফেরত পেয়েছে PM CARES Fund।
এক বছরে কত টাকা এল?
অডিটেড হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শুরুতে PM CARES Fund-এর হাতে ছিল প্রায় ৭,১৭৩ কোটি টাকা। সেই অর্থবর্ষে বিভিন্ন উৎস থেকে তহবিলে এসেছে প্রায় ১,২৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ছিল দেশি ও বিদেশি অনুদান, সুদ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুদান। এর মধ্যে শুধুমাত্র দেশি অনুদানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৭৯.০৪ কোটি টাকা। বিদেশি অনুদান এসেছে প্রায় ৯২.৮৩ লক্ষ টাকা। এছাড়াও বিভিন্ন ইমপ্লিমেন্টিং এজেন্সির থেকে ফেরত এসেছে প্রায় ৩২৪.৬৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ওই অর্থবর্ষে PM CARES Fund থেকে খরচ হয়েছে মাত্র ৮৭.৮৫ লক্ষ টাকা। ফলে বছরের শুরুতে থাকা ৭,১৭৩ কোটি টাকা, নতুন করে আসা অর্থ এবং সুদ-সহ অন্যান্য প্রাপ্তির পর বছরের শেষে তহবিলের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৮,৪৫২.০৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, একদিকে তহবিলে নতুন অর্থ এসেছে, অন্যদিকে খরচের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। তার সঙ্গে ফিক্সড ডিপোজিট থেকে পাওয়া সুদ যোগ হওয়ায় মোট corpus আরও বেড়েছে।
PM CARES-এর পুরো নাম Prime Minister's Citizen Assistance and Relief in Emergency Situations Fund। করোনা অতিমারির মতো বড় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে এই তহবিল তৈরি করা হয়েছিল। এটি একটি পাবলিক চ্যারিটেবল ট্রাস্ট। প্রধানমন্ত্রী এই তহবিলের এক্স অফিসিও চেয়াপম্যান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী এক্স অফিসিও ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তহবিলের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, PM CARES Fund মূলত ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছায় দেওয়া অনুদানের উপর নির্ভরশীল। সরকারি বাজেট থেকে এই তহবিলে কোনও অর্থ দেওয়া হয় না।
PM CARES Fund-এ অনুদান দিলে আয়কর আইনের 80G ধারায় ১০০ শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়। পাশাপাশি সংস্থাগুলির দেওয়া অনুদান Companies Act, 2013 অনুযায়ী Corporate Social Responsibility বা CSR expenditure হিসেবেও গণ্য হতে পারে। ফলে ব্যক্তি এবং কর্পোরেট—দুই ক্ষেত্র থেকেই এই তহবিলে অনুদান এসেছে।
PM CARES Fund তৈরির পর প্রথম অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ৩১ মার্চ ২০২০-এ শেষ হওয়া বছরে স্বেচ্ছা অনুদান হিসেবে প্রায় ৩,০৭৫.৮৫ কোটি টাকা এসেছিল। বিদেশি অনুদানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯.৬৮ কোটি টাকা। পরের অর্থবর্ষ, ২০২০-২১-এ স্বেচ্ছা অনুদান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭,১৮৩.৭৮ কোটি টাকা। বিদেশি অনুদান ছিল প্রায় ৪৯৪.৯২ কোটি টাকা। ওই বছর নিয়মিত অ্যাকাউন্ট থেকে সুদ বাবদ আরও প্রায় ২২৪.৩৩ কোটি টাকা আয় হয়েছিল।
এখন তহবিলের সামনে বড় প্রশ্ন কী?
নতুন অডিটেড হিসাব থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই তহবিলে এখন ৮,৪৫২ কোটি টাকার বেশি রয়েছে এবং তার বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি আমানতে রাখা হয়েছে একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তহবিল থেকে খরচের পরিমাণ ছিল ১ কোটি টাকারও কম। ফলে তহবিলের বিপুল অর্থ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কোথায় রাখা হচ্ছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে তা ব্যবহার করা হবে—এই আর্থিক কাঠামোও স্বাভাবিকভাবেই নজরে আসছে এবং তা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)