১৫টি নথি কাজে এল না, নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ! অসমের বাসিন্দাকে শেষে ‘বিদেশি’ই বলল আদালত

১৯৫১ সালের এনআরসি-র কম্পিউটারাইজড কপি, স্কুলের শংসাপত্র, প্যান কার্ড, জমির দলিল ও ভোটার তালিকা-সহ ১৫টি নথি জমা দিয়েও নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলেন অসমের এক বাসিন্দা। বিদেশি ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে গুয়াহাটি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ওই ব্যক্তিকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করেছে।

Jul 02, 2026 - 11:36
0 0
১৫টি নথি কাজে এল না, নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ! অসমের বাসিন্দাকে শেষে ‘বিদেশি’ই বলল আদালত

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৫১ সালের এনআরসি-র নথি, একাধিক ভোটার তালিকা, স্কুলের শংসাপত্র, প্যান কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র— একসঙ্গে ১৫টি নথি জমা দিয়েও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারলেন না অসমের এক বাসিন্দা। বিদেশি ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে তাঁকে ‘বিদেশি’ বলেই ঘোষণা করল গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, জমা দেওয়া নথিগুলির বেশিরভাগই আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।

এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাকারী গুয়াহাটির কাছে ভাড়া বাড়িতে থাকা এক দিনমজুর। তবে তাঁর আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি বলে পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামিমা জাহানের ডিভিশন বেঞ্চ ৩০ জুন রিট পিটিশন খারিজ করে জানায়, বিদেশি আইন, ১৯৪৬-এর ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী তিনি যে ভারতীয় নাগরিক, সেই প্রমাণের দায় তিনি পূরণ করতে পারেননি।

কোন কোন নথি জমা দিয়েছিলেন তিনি?

নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ওই ব্যক্তি ১৫টি নথি আদালতে পেশ করেন। এর মধ্যে ছিল ১৯৫১ সালের এনআরসি-তে তাঁর বাবা ও ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম থাকা কম্পিউটারাইজড কপি, ১৯৬৬ থেকে ২০১৭ সালের বিভিন্ন ভোটার তালিকা, ১৯৭৩ সালের একটি জমি কেনার দলিল, ২০১৭ সালের স্কুলের শংসাপত্র, প্যান কার্ড এবং ইলেক্টরস ফোটো আইডেন্টিটি কার্ড (ইপিক)। পাশাপাশি তাঁর বাবা সাক্ষ্য দিয়ে পারিবারিক পরিচয়।

আদালতে তিনি জানান, ১৯৮৮ সালে তাঁর জন্ম। নদীভাঙনের কারণে তাঁদের পরিবার বারবার গ্রাম বদল করতে বাধ্য হয়েছিল। চরাই খাসারা থেকে ধোবাকুড়া, সেখান থেকে ঘুগুডোবা এবং পরে হাশদোবায় চলে আসে পরিবারটি। ১৯৯৯ সালে তিনি হাশদোবা আঞ্চলিক হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন।

কেন বাতিল হল ১৯৫১ সালের এনআরসি?

মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল ১৯৫১ সালের এনআরসি-র কপি। কিন্তু আদালত জানায়, এগুলি ছিল কেবল কম্পিউটার থেকে তৈরি প্রিন্টআউট, যা আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হয়নি। নথিতে 'Generated by DLDD Version 6.0' উল্লেখ থাকলেও প্রমাণ আইন, ১৮৭২-এর ৬৫বি ধারা (বর্তমানে ভারতীয় সাক্ষ্য আইন, ২০২৩-এর ৬৩(৪) ধারা) অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শংসাপত্র জমা দেওয়া হয়নি। ফলে এই নথির কোনও প্রমাণমূল্য নেই।

এর পাশাপাশি জনগণনা আইন, ১৯৪৮-এর ১৫ নম্বর ধারা উল্লেখ করে আদালত বলে, জনগণনার তথ্য আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ১৯৫১ সালের এনআরসি-র উপর ভিত্তি করে পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণের দাবিও করা গেল না।

স্কুলের শংসাপত্র, জমির দলিলও টিকল না

এবার আসা যাক স্কুলের নথিতে। ২০১৭ সালের স্কুলের শংসাপত্রও আদালত গ্রহণ করেনি। কারণ, ওই শংসাপত্র যিনি দিয়েছিলেন, সেই প্রধান শিক্ষককে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয়নি। স্কুলের ভর্তি রেজিস্টারও আদালতে পেশ করতে পারেননি তিনি।

১৯৭৩ সালের জমি কেনার দলিলও এক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে বাতিল হয়ে যায়। আদালতের প্রশ্ন, জমিটি যদি সত্যিই পরিবারের হয়ে থাকে, তা হলে উত্তরাধিকার সূত্রে তার হস্তান্তরের কোনও সরকারি নথি কোথায়? জমির খাজনার রেকর্ড বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কোনও তথ্যও আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।

প্যান কার্ড এবং ভোটার পরিচয়পত্র সম্পর্কে আদালত স্পষ্ট জানায়, এগুলি ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়— এই আইনি অবস্থান বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত।

ভোটার তালিকায় মিলল একাধিক অসঙ্গতি

আদালত ভোটার তালিকাগুলিতেও গুরুতর অসঙ্গতি খুঁজে পায়। এক পরিবারের সদস্যের বয়স ১৯৭৯ সালের তালিকায় ২৫ বছর হলেও ১৯৮৯ সালে তা মাত্র ২৯ বছর দেখানো হয়েছে। আবার তালিকায় এমন কয়েকজনের নামও ছিল, যাঁদের সঙ্গে মামলাকারীর পারিবারিক সম্পর্কের কোনও প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পরিবারের সদস্যদের নাম তিনটি আলাদা গ্রামের ভোটার তালিকায় থাকা। ধোবাকুড়া, ঘুগুডোবা এবং হাশদোবার ভোটার তালিকার মধ্যে ধারাবাহিক সম্পর্ক আদালতের সামনে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। আদালতের মতে, তিনটি গ্রামের পরিবারগুলিকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রমাণ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নেই।

মৌখিক সাক্ষ্যও যথেষ্ট নয়

মামলাকারীর বাবার মৌখিক সাক্ষ্যও আদালত গ্রহণ করেনি। বিচারপতি জানান, নাগরিকত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধুমাত্র মৌখিক বক্তব্যের উপর নির্ভর করা যায় না। নথিভিত্তিক প্রমাণই এখানে প্রধান।

এ ছাড়া জেরার সময়ও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। প্যান কার্ডে মামলাকারীর জন্মসাল ১৯৮৮ উল্লেখ থাকলেও তাঁর বাবা তা নিশ্চিত করতে পারেননি। এমনকি আদালতের পর্যবেক্ষণ, সাক্ষ্য দিতে আসা ব্যক্তি ২০১৫ সালের ভোটার তালিকায় থাকা ব্যক্তির সঙ্গে মেলে না, যদিও ১৯৭০ সালের তালিকায় একই নাম রয়েছে।

সব দিক খতিয়ে দেখে গুয়াহাটি হাইকোর্ট জানায়, বিদেশি ট্রাইব্যুনালের রায়ে কোনও আইনি বা তথ্যগত ত্রুটি নেই। মামলাকারীর আইনজীবীও প্রমাণ করতে পারেননি যে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত কোনও দিক থেকে অযৌক্তিক বা আইনবিরুদ্ধ। সেই কারণেই ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে রিট পিটিশন খারিজ করে দেয় আদালত। ১৫টি নথি এবং মৌখিক সাক্ষ্য পেশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User