ঋতুপর্ণার হাতে নেতাজির ছবি, রাতের কলকাতার রাজপথে মহিলাদের স্বাধীনতার মিছিল

স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের রাতে অন্য এক স্বাধীনতার ছবি দেখল কলকাতা। শুক্রবার রাত নামতেই রাজপথে পা রাখলেন আট থেকে আশি, বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মহিলা। হাতে কখনও জাতীয় পতাকা, কখনও নেতাজির ছবি, কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গান।

Aug 15, 2026 - 19:06
0 0
ঋতুপর্ণার হাতে নেতাজির ছবি, রাতের কলকাতার রাজপথে মহিলাদের স্বাধীনতার মিছিল

স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের রাতে অন্য এক স্বাধীনতার ছবি দেখল কলকাতা। শুক্রবার রাত নামতেই রাজপথে পা রাখলেন আট থেকে আশি, বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মহিলা। হাতে কখনও জাতীয় পতাকা, কখনও নেতাজির ছবি, কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গান। বার্তা একটাই, এই শহর শুধু পুরুষদের নয়, কলকাতার প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি কোণ মহিলাদেরও। রাত যতই গভীর হোক, নিরাপদে পথ চলার অধিকার তাঁদেরও রয়েছে। সেই বার্তাকেই সামনে রেখে দ্য ওয়ালের উদ্যোগে আয়োজিত হল মহিলাদের বিশেষ ওয়াকাথন, ‘মাই সিটি, মাই রাইড, ওয়াক বিয়ন্ড মিডনাইট’। (Kolkata Night Walkathon, The Wall Walkathon Kolkata)

শুক্রবার রাত ৯টায় বালিগঞ্জ শিক্ষাসদন স্কুলের সামনে থেকে শুরু হয় এই পদযাত্রা। গোলপার্ক ঘুরে ফের বালিগঞ্জ শিক্ষাসদনে ফিরে আসেন অংশগ্রহণকারীরা। শুরু থেকেই চোখে পড়ে মহিলাদের উৎসাহ ও স্বতঃস্ফূর্ততা। বয়সের কোনও সীমারেখা সেখানে ছিল না। বিভিন্ন বয়সের বহু মহিলা একসঙ্গে পা মেলান এই বিশেষ আয়োজনে। তাঁদের নিরাপদে পথ দেখাতে সঙ্গে ছিল কলকাতা পুলিশ। কলকাতা পুলিশের দুর্গা বাহিনীর সদস্যরাও এই ওয়াকাথনে অংশ নেন।

এই রাতের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত (Rituparna Sengupta)। হাতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি নিয়ে গোটা পথ হাঁটেন অভিনেত্রী। শুধু উপস্থিত থাকাই নয়, গোটা উদ্যোগের আবেগের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন তিনি। কখনও তাঁর সঙ্গে গলা মেলান ইমন-পৌষালীরা, কখনও ভিড়ের মধ্যে থেকেই উঠে আসে অন্য মহিলাদের কণ্ঠ।

ঋতুপর্ণার কথাতেও উঠে আসে এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, ‘মহিলাদের জন্য আয়োজিত এমন কোনও উদ্যোগে তিনি সবসময়ই থাকতে চান। কারণ মুখে যতই নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার কথা বলা হোক, বাস্তবের ছবিটা এখনও উদ্বেগজনক। ছোট শিশুদের উপর নির্যাতন থেকে শুরু করে রাতে বাড়ি ফেরার পথে মহিলাদের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা, সবকিছুই মনে করিয়ে দেয় যে এই আন্দোলন থামিয়ে দিলে চলবে না।’

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে তিনি দ্য ওয়ালকে ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে অগ্নিমিত্রা পাল এবং তাঁর বন্ধুদের আমন্ত্রণের কথাও উল্লেখ করেন। তবে ঋতুপর্ণার কাছে এই ওয়াকাথনে যোগ দেওয়া নিছক কোনও আমন্ত্রণ রক্ষা নয়, বরং নিজের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এত মানুষকে একসঙ্গে এই আন্দোলনে সামিল হতে দেখে তাঁর মতে, সেটাই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

হাঁটার ফাঁকেই বদলে যায় রাজপথের আবহ। অভিনেত্রী ইমন চক্রবর্তী কখনও গেয়ে ওঠেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহ কপাট’। আবার ভিড়ের মধ্যে থেকেই একসঙ্গে কণ্ঠ মেলায় মহিলারা, গেয়ে ওঠেন ‘মেরে ওয়াতন কে লোগো’। ‘ফ্রিডম বিয়ন্ড মিডনাইট’-এর থিম সংয়েও গলা মেলান অনেকে। দেশাত্মবোধ, স্বাধীনতা এবং নারীর নিরাপত্তার বার্তা যেন মিশে যায় এক রাতের এই পদযাত্রায়।

এই ওয়াকাথনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছাড়াও ছিলেন, জয়া এহসান, চৈতি ঘোষাল, ইন্দ্রাণী হালদার, ইমন চক্রবর্তী, সেনকো গোল্ডের জয়িতা সেন, কেয়া ঘোষ, পুরপ্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে-সহ আরও বহু বিশিষ্টজন। যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়কেও দেখা যায় হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে পা মেলাতে।

হাঁটা শেষে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, মহিলাদের জন্য কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। ইচ্ছে থাকলে তাঁরা সবকিছুই করতে পারেন। তাঁর এই বক্তব্য যেন গোটা রাতের বার্তাটাকেই আরও দৃঢ় করে দেয়।

কলকাতার রাজপথে শুক্রবারের এই পদযাত্রা তাই শুধু একটি ওয়াকাথন হয়ে থাকল না, হয়ে উঠল আত্মবিশ্বাসের এক দৃশ্যমান উদযাপন। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত থেকে ইমন চক্রবর্তী, অগ্নিমিত্রা পাল থেকে অসংখ্য সাধারণ মহিলা, সকলের একসঙ্গে পথচলা যেন স্পষ্ট করে দিল, নিরাপদ ও স্বাধীন শহরের দাবি কোনও একক কণ্ঠের নয়, এটি সকলের সম্মিলিত প্রত্যাশা। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সেই প্রত্যয় নিয়েই রাতের কলকাতায় পা বাড়ালেন বাংলার মহিলারা। বার্তা রইল একটাই, শহরকে নিজের করে নেওয়ার এই পথচলা থামবে না। বরং আরও অনেক নারী, আরও অনেক কণ্ঠ এবং আরও অনেক পা মিলিয়ে আগামী দিনের কলকাতাকে আরও নিরাপদ, আরও স্বাধীন করে তুলবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User