জোড়াফুল গেল ‘ফ্রিজে’, মমতার হাতে বাঁশি আর ঋতব্রতের কাঁচি? কমিশনের তালিকায় ফ্রি ১৮৪ প্রতীক
জোড়াফুল প্রতীক ও তৃণমূলের নাম আপাতত ফ্রিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। মমতা ও ঋতব্রত শিবিরকে নতুন নাম ও প্রতীক বেছে নিতে হবে।
জোড়াফুল আপাতত হিমঘরে। তৃণমূলের নাম ও চেনা প্রতীক (TMC Symbol) ব্যবহার করতে পারবে না বিবদমান দুই শিবিরের কেউই। নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশের পর তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) শিবিরের সামনে এখন জোড়া প্রশ্ন—নতুন নাম কী হবে, আর ভোটে লড়তে হবে কোন প্রতীক (Symbol) নিয়ে?
দুই শিবিরের পছন্দ অবশ্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। তবে নির্বাচন কমিশনের ‘ফ্রি সিম্বল’-এর তালিকায় রয়েছে মোট ১৮৪টি প্রতীক। এয়ার কন্ডিশনার থেকে আলমারি, কাঁচি থেকে বাঁশি, কোলাপুরি চপ্পল, মাইক থেকে দূরবীন—রাজনীতির রসিকদের কল্পনা দৌড় করানোর মতো উপকরণের অভাব নেই সেখানে।
কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিবিরগুলিকে সাধারণত পছন্দের কয়েকটি নাম এবং মুক্ত প্রতীকের তালিকা থেকে একাধিক বিকল্প জমা দিতে হয়। উপলব্ধতা এবং অন্য কোনও দলের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ফলে নীচের কোনও প্রতীকই এখনও মমতা বা ঋতব্রতের নামে বরাদ্দ হয়নি। তবে বঙ্গ রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন প্রতীক কার সঙ্গে সবচেয়ে ভাল মানাবে, তা নিয়ে মজার জল্পনা শুরু হতেই পারে।
কমিশনের তালিকায় ৬৪ নম্বরে রয়েছে বাঁশি। সিপিএমের এক রাজ্য নেতা খোঁচা দিয়ে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে এই প্রতীকের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। দল ভাঙার পর এখনও তাঁর ডাকে কতজন রাস্তায় নামেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাঁশিতে ফুঁ দিলে পুরনো সৈনিকেরা আবার কালীঘাটমুখী হন কি না, সেটাই দেখার।
তিনি আরও বলেন, বাঁশির আরও একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পর মমতা এখন বিরোধী রাজনীতির নতুন সুর বাঁধতে চাইছেন। সেই সুর কতটা শ্রুতিমধুর হবে এবং কতটা ভোট টানবে, তা অবশ্য অন্য প্রশ্ন। আবার বিজেপির মুখপাত্র শঙ্কু দেব পাণ্ডা বলেন, তালিকায় দেখলাম চপ্পলও রয়েছে। ওটাও বেশ মানানসই হতে পারে তৃণমূলের জন্য।
কমিশনের ৪৪ নম্বর প্রতীক ‘Colour Tray and Brush’, অর্থাৎ রঙের প্যালেট এবং তুলি। দীর্ঘদিন ধরে নীল-সাদা রঙের সঙ্গে মমতা সরকারের পরিচয় জড়িয়ে ছিল। কলকাতার রাস্তা, উড়ালপুল, রেলিং থেকে সরকারি ভবন—সবেতেই সেই রঙের ছোঁয়া দেখা গিয়েছে। ফলে জোড়াফুল না থাকলেও রং-তুলি দিয়ে পুরনো স্মৃতিকে ফের উস্কে দেওয়া যেতে পারে।
ঋতব্রতের হাতে ‘কাঁচি’?
কমিশনের তালিকায় ১৩৩ নম্বরে রয়েছে কাঁচি বা Scissors। তৃণমূলের এক প্রাক্তন মুখপাত্র বলেন,বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋতব্রত শিবিরের জন্য এর চেয়ে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক বিভাজন এখনও বিচারাধীন হলেও রাজনৈতিকভাবে দল যে আড়াআড়ি কেটে গিয়েছে, তা আর গোপন নেই। ফলে কাঁচি প্রতীক পেলে বিরোধীরা বলতেই পারেন, দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অস্ত্রটিই হাতে তুলে নিলেন ঋতব্রতেরা। তবে ঋতব্রত শিবির অন্য ব্যাখ্যা দিতে পারে—তারা পুরনো জট কেটে নতুন রাজনৈতিক পথ তৈরি করতে চাইছে।
‘মাইক’ পেলে সুবিধা কার?
তালিকার ৯৭ নম্বরে রয়েছে মাইক। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সুবক্তা হিসেবেই পরিচিত। সংসদ থেকে রাজনৈতিক সভা—মাইকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পুরনো। ফলে নতুন শিবিরের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই প্রতীক মন্দ নয়।
মাইক প্রতীকের প্রচারমূলক সুবিধাও রয়েছে। দেওয়াল লিখনে বোঝানো সহজ, ইভিএমে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। নতুন দলের ক্ষেত্রে প্রতীক যত সহজ এবং দৃশ্যত স্পষ্ট হয়, ভোটারদের কাছে সেটি পৌঁছে দেওয়া তত সুবিধাজনক।
ঋতব্রত শিবিরের সম্ভাব্য তালিকায় থাকতে পারে দূরবীন এবং কম্পিউটার মাউস। দূরবীন দিয়ে তারা ভবিষ্যতের বাংলা দেখার দাবি করতে পারে। আবার সমালোচকেরা বলবেন, শিবিরটি এখনও দূর থেকে কালীঘাটের গতিবিধিই নজরে রাখছে।
কম্পিউটার মাউস প্রতীক নিলে নিজেদের অপেক্ষাকৃত আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। তবে ভোটাররা যেন মাউস দেখে ‘ক্লিক’ করার বদলে বোতাম টেপেন, তা প্রচারে বুঝিয়ে দিতে হবে।
কাকে দেওয়া যেতে পারে ‘রাবার স্ট্যাম্প’?
কমিশনের তালিকায় রয়েছে Rubber Stamp বা রাবারের সিলও। কিন্তু দুই শিবিরের কেউই সম্ভবত এই প্রতীক চাইবে না। কারণ প্রতীক হাতে পাওয়ার আগেই প্রতিপক্ষ প্রচার শুরু করে দেবে—অমুক শিবির দিল্লির রাবার স্ট্যাম্প, তমুক শিবির পুরনো নেতৃত্বের রাবার স্ট্যাম্প।
একইভাবে তালিকায় থাকা চেয়ার, সোফা, আলমারি, প্রেসার কুকার, ফ্রিজ, ডাস্টবিন কিংবা রোড রোলার নিয়েও রাজনৈতিক রসিকতার শেষ থাকবে না। ফ্রিজ প্রতীকটি যদিও তালিকায় ‘Refrigerator’ নামে রয়েছে, জোড়াফুল ইতিমধ্যেই ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়ায় কোনও শিবির সম্ভবত আর সেই ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
সব প্রতীক পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া যাবে না
কমিশনের ১৮৪টি মুক্ত প্রতীকের সবক’টি অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের জন্য উপলব্ধ নয়। যেমন কেটলি এবং লেডিস পার্স-এর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে ব্যবহারের বিধিনিষেধ রয়েছে। আবার কোনও প্রতীক ইতিমধ্যে কোনও স্বীকৃত বা নথিভুক্ত দলের ব্যবহারে থাকলে সেটিও দেওয়া যাবে না।
ফলে দুই শিবির তালিকা জমা দিলেই পছন্দের প্রথম প্রতীক পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কমিশনকে দেখতে হবে প্রতীকটি সংশ্লিষ্ট উপনির্বাচনের জন্য উপলব্ধ কি না এবং তা নিয়ে বিভ্রান্তির আশঙ্কা রয়েছে কি না।
প্রতীকের লড়াই মোটেই ছেলেখেলা নয়
রাজনীতির বাইরে থেকে বিষয়টি মজার মনে হলেও দুই শিবিরের কাছে প্রতীক নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে তৃণমূল মানেই ঘাসের উপর জোড়াফুল। সেই প্রতীকের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিচয় প্রায় একাকার হয়ে গিয়েছে।
নতুন প্রতীক হাতে পেলে অল্প সময়ের মধ্যে সেটিকে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। গ্রামবাংলার বুথ পর্যন্ত বোঝাতে হবে, ইভিএমে কোন বোতামটি চাপতে হবে। সংগঠন, প্রচারযন্ত্র এবং কর্মীসংখ্যা—সব কিছুরই পরীক্ষা হবে সেই কাজে।
শেষ পর্যন্ত মমতার হাতে বাঁশি উঠবে, ঋতব্রত পাবেন কাঁচি, নাকি কমিশন সম্পূর্ণ অন্য কোনও প্রতীক বেছে দেবে—তা এখনও অনিশ্চিত। তবে আপাতত নিশ্চিত একটাই: বাংলার রাজনীতিতে জোড়াফুল নিয়ে লড়াই থামলেও প্রতীক নিয়ে রসিকতার মরসুম সবে শুরু হয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)