ঘড়িতে ০:০৭, গ্যালারিতে বন্ড! ইউএস ওপেন ফাইনালে রলেক্সের খরচে ওমেগার অভাবনীয় বাজিমাত
ঘড়িতে ০:০৭, আর স্ক্রিনে পিয়ার্স ব্রসনান! ইউএস ওপেনে রলেক্সের টাইমিংয়ে বিনা পয়সায় বাজিমাত করল ওমেগা। এক অভাবনীয় বিজ্ঞাপনের গল্প।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ০:০৭। টিভি সম্প্রচারের ক্যামেরা চকিতে ঘুরে গেল গ্যালারির দিকে। স্ক্রিনে তখন পিয়ার্স ব্রসনান।
না, হাতে তাক করা নেই কোনও বন্দুকের নল। নেই বিখ্যাত অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি। এমনকি চেনা মার্টিনি গ্লাসও উধাও। পেশাদার ঠাটবাট নিয়ে আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে আলেকজান্ডার জেরেভ ও বেন শেলটনের ফাইনাল ম্যাচ দেখছেন তিনি (US Open)।
আর তাতেই বাজিমাত!
কয়েক সেকেন্ডের জন্য টেনিস কোর্ট নিখাদ হলিউড সিনেমা। রলেক্সের ঘড়ি, ০:০৭-এর মোক্ষম টাইমিং আর জেমস বন্ড। বাকি গল্পটা দর্শকদের মগজ নিমেষে বুনে ফেলল।
রলেক্সের মঞ্চে ওমেগার মুচকি হাসি
২০১৮ সাল থেকে ইউএস ওপেনের অফিশিয়াল টাইমকিপার রলেক্স। কোর্টের পাশে তাদের ঘড়ি থাকাটাই দস্তুর। স্পোর্টস ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে তারা।
স্পনসরশিপের মূল কথা হল বারবার চোখের সামনে লোগো তুলে ধরা। কিন্তু ০:০৭ টাইমিংয়ের সঙ্গে ব্রসনানের মুখ জুড়ে গিয়ে যে ম্যাজিক তৈরি হল, তা কোনও কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী সংস্থাও বানাতে পারেনি (James Bond)। ব্রসনান মানেই নয়ের দশকের জেমস বন্ড। 'গোল্ডেনআই' ছবি দিয়ে যাঁর বন্ড-সফর শুরু।
আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে গল্পের আসল টুইস্ট! কারণ, ব্রসনানের বন্ড কখনও রলেক্স পরেননি। তাঁর হাতে সবসময় শোভা পেত ওমেগা সিমাস্টার! অর্থাৎ, বিপুল টাকা খরচ করে রলেক্স দেখাল ০:০৭। আর দর্শকের অবচেতন মনে ভেসে উঠল ওমেগার কথা (Omega Watches)। রলেক্সের ঘড়ি আর বন্ডের মুখের যুগলবন্দিতে বিনা পয়সায় নিখুঁত এক বিজ্ঞাপন পেয়ে গেল তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড!
মগজাস্ত্র ও বিজ্ঞাপনের নিখুঁত মনস্তত্ত্ব
মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে নিখাদ ম্যাজিক বলছেন। এসপি জৈন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক অশিতা আগরওয়ালের কথায়, 'ভোক্তা নিজের মনেই বিজ্ঞাপনটি সম্পূর্ণ করেন।'
আধুনিক যুগে ক্রেতাকুল অত্যন্ত চালাক। তাঁরা জানেন, তারকাদের টাকা দিয়ে কথা বলানো হয়। কিন্তু এখানে তেমন কিছু ঘটেনি। দর্শক যখন নিজেই দুটো আলাদা বিষয়ের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পান, তখন সেই স্মৃতি মগজে গভীরভাবে গেঁথে যায় (Viral Marketing)। অশিতা আরও বলেন, 'কয়েক দশকের সাংস্কৃতিক স্মৃতি আপনি সোমবার সকালে কোনও সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ার রুমে বসে জোর করে তৈরি করতে পারবেন না।' এই মুহূর্তটি সফল হয়েছে। কারণ, বন্ড, ব্রসনান এবং ওমেগার সম্পর্ক আগে থেকেই মানুষের মনে গাঁথা ছিল।
পুরোনো ইতিহাস ও রিভার্স অ্যামবুশ
অবশ্য রলেক্সও বন্ডের দুনিয়ায় একেবারে ব্রাত্য নয়। শন কনারির মতো আদি বন্ডরা একসময় রলেক্স সাবমেরিনারই পরতেন। ফলে এই একটি ফ্রেমে লুকিয়ে ঘড়ির এক বিপুল ইতিহাস। অতীত আর বর্তমানের অদ্ভুত এক মেলবন্ধন।
বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় 'অ্যামবুশ মার্কেটিং' অতি পরিচিত শব্দ। যেখানে স্পনসর না হয়েও স্পোর্টিং ইভেন্ট থেকে কোনও ব্র্যান্ড ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। কিন্তু এখানে ঘটল উলটপুরাণ! যাকে অনায়াসে বলা যায় 'রিভার্স অ্যামবুশ' (Rolex)। ওমেগা কিছুই করেনি। মাঠে তাদের নামগন্ধও ছিল না। রলেক্স তাদের নিজস্ব ঘড়িতে নিয়মমাফিক সময় দেখাচ্ছিল। আর টিভি ডিরেক্টর স্রেফ ০:০৭ দেখে ব্রসনানের মুখটা জুড়ে দেন। এক লহমায় জন্ম নেয় জেমস বন্ডের এক অঘোষিত বিজ্ঞাপন।
এখন প্রশ্ন, রলেক্স কি এর থেকে ফায়দা তোলার চেষ্টা করবে?
বিশেষজ্ঞদের কড়া সতর্কবার্তা, একদমই নয়। রসিকতা বারবার ব্যাখ্যা করতে গেলে তার ধার কমে যায়। ইন্টারনেট ইতিমধ্যে এই মুহূর্তটি লুফে নিয়েছে (Tennis News)। ঘড়ি তার নিজের কাজ করেছে। টিভি ডিরেক্টর তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়েছেন। আর ব্রসনান স্রেফ চুপ করে খেলা দেখেছেন। এই তিনের মিলনেই তৈরি হয়েছে এমন এক অনবদ্য বিজ্ঞাপন, যার বরাত কেউ দেয়নি!
ঠিক যেন বন্ডের মতোই... রহস্যময় ও নিখুঁত।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)