'নিট প্রশ্নফাঁস এবার অসম্ভব', দাবি কেন্দ্রের, NTA-কে নিশ্ছিদ্র করতে একাধিক নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের
কেন্দ্রের সওয়াল শুনলেও সুপ্রিম কোর্ট পরীক্ষা ব্যবস্থার স্থায়ী পরিকাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, "একটি পরীক্ষা ঠিকঠাক হলেও পরের পরীক্ষার সময় সম্পূর্ণ অন্য ছবি ফুটে ওঠে। তাই পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সুরক্ষিত পরিকাঠামোর সাহায্যে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন।"
নিট-ইউজি (NEET-UG 2026) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে (NEET UG 2026 paper leak) কেন্দ্র করে একাধিক আবেদনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) বড় দাবি করল কেন্দ্র সরকার। বুধবার শীর্ষ আদালতে কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, দেশে নিট পরীক্ষা পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থা অত্যন্ত সুরক্ষিত ও 'নিচ্ছিদ্র' (Foolproof), যা কোনওভাবেই ভেদ করা সহজ নয়।
শুধু তা-ই নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে গাড়িতে জিপিএস (GPS) ট্র্যাকিং সহ নানা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা আদালতকে জানানো হয়েছে। তবে তার উত্তরে পাল্টা কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কেবল মুখে বা কাগজে-কলমে নিরাপত্তা দাবি করাই যথেষ্ট নয়। জাতীয় স্তরের এই প্রবেশিকা পরীক্ষা আয়োজনকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-কে একটি শক্তপোক্ত ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (Institutionalise) দিতে হবে।
বিচারপতি পিএস নরসিমহা এবং বিচারপতি অলক আরাধের ডিভিশন বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন কেন্দ্র জানায়, প্রশ্নপত্র তৈরির ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। বহুসংখ্যক মডারেটর যৌথভাবে কোয়েশ্চেন ব্যাঙ্ক তৈরি করেন, তবে চূড়ান্ত পরীক্ষায় ঠিক কোন প্রশ্নগুলি থাকবে তা কোনও একক ব্যক্তির পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
কেন্দ্র আরও জানায়, ছাপাখানা থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পরিবহনের সময়ে বিশেষ কনটেইনার বা গাড়ি ব্যবহার করা হয়, যাতে জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস (GPS) বসানো থাকে। গাড়ির সাময়িক মুভমেন্ট বা সূক্ষ্ম নড়াচড়াও কেন্দ্রীয়ভাবে রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ছাপাখানায় সিসিটিভি এবং কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর (CISF) কড়া পাহারা থাকে।
কেন্দ্রের সওয়াল শুনলেও সুপ্রিম কোর্ট পরীক্ষা ব্যবস্থার স্থায়ী পরিকাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, "একটি পরীক্ষা ঠিকঠাক হলেও পরের পরীক্ষার সময় সম্পূর্ণ অন্য ছবি ফুটে ওঠে। তাই পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সুরক্ষিত পরিকাঠামোর সাহায্যে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন।"
কী কী বিষয়ে জোর দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট?
প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে অনলাইন পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে সাইবার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থায়ী ও সরকারিভাবে সুরক্ষিত নিজস্ব পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে থার্ড-পার্টি বা বেসরকারি কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমে।
তাছাড়া, প্রশ্নপত্র ছাপানো ও সিল করার পুরো প্রক্রিয়াটি নজরদারির জন্য একটি স্থায়ী বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষা পরিচালনার সমস্ত খুঁটিনাটি সামলাতে পেশাদার ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সমস্ত সংবেদনশীল তথ্য ও পরীক্ষার সুরক্ষায় একটি সম্পূর্ণ সরকারি বা ডেটাবেস তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সমগ্র পরীক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন অন্তত একজন ডিরেক্টর পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, প্রাক্তন ইসরো (ISRO) প্রধান ডঃ কে রাধাকৃষ্ণন কমিটি এবং নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্সের সুপারিশগুলি বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানিয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিবকে হলফনামা (Affidavit) পেশ করতে হবে। এনটিএ-র সাইবার নিরাপত্তা, স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র তৈরি এবং সিক্রেসি উইং চালুর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে আদালত। তিন সপ্তাহ পর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে।
উল্লেখ্য, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সামনে আসতেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র নেতৃত্বে অনশন ও সংসদ অভিযানের মতো উগ্র প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা যায়।
গত ২০ জুলাই হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী সংসদ ভবনের দিকে এগোতে গেলে দিল্লিতে তীব্র হাঙ্গামা বাঁধে। পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টায় কাঁদানে গ্যাসের সেল ছোড়ে ও লাঠিচার্জ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। দেশজুড়ে মারাত্মক ছাত্র ক্ষোভের চাপে পড়ে গত ৩০ জুলাই ইস্তফা দিতে বাধ্য হন তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)