নেপালে আটকে পড়েছিলেন, অবশেষে কলকাতায় খরাজ! স্ত্রী প্রতিভাকে নিয়ে ফিরেই বললেন, ‘আপনাদের ভালবাসাই…’
অবশেষে কলকাতায় ফিরলেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। নেপালে শুটিং করতে গিয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা।
অবশেষে কলকাতায় ফিরলেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। নেপালে শুটিং করতে গিয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী প্রতিভাও। রাস্তা বন্ধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, প্রবল বৃষ্টি এবং ফ্ল্যাশ ফ্লাডের কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল দেশে ফেরার পথ। শেষ পর্যন্ত বিকল্প পথে গোরক্ষপুর পৌঁছে সেখান থেকে বিমানে কলকাতায় ফিরেছেন খরাজ ও প্রতিভা। শহরে ফিরেই ভিডিও বার্তায় নিজের সুস্থতার খবর জানিয়েছেন অভিনেতা। জানিয়েছেন, এই কঠিন সময়ে যাঁরা তাঁর জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাঁদের ভালবাসা তিনি কখনও ভুলবেন না।
ভিডিও বার্তায় খরাজ বলেন, “নমস্কার। আমি খরাজ মুখার্জি। আপনারা সবাই বড় চিন্তায় ছিলেন যে আমি পোখরাতে শুটিং করতে গিয়ে আটকে গিয়েছিলাম। এটা ঠিক কথাই, সেখানে অনেক রকম সমস্যা হয়েছে। সে সমস্ত সমস্যা পার করে অবশেষে গোরখপুরে যাই এবং সেখান থেকে আমি আর প্রতিভা ফ্লাইট ধরে জাস্ট নাও ফিরলাম।”
এরপরই সকলকে ধন্যবাদ জানান অভিনেতা। তাঁর কথায়, “আপনাদের ভালবাসাই আমাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে। অসংখ্য ধন্যবাদ। সামনে আরও সুন্দর সুন্দর কাজ আপনাদের উপহার দেব এই আশা রাখি। আপনারা যে আমাকে এত উইশ করেছেন, আমি সত্যিই ধন্য।”
খরাজের এই ভিডিও বার্তা স্বস্তি এনে দিয়েছে তাঁর অনুরাগী এবং শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে। কারণ মাত্র একদিন আগেও নেপালে আটকে থাকা অভিনেতাকে নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ২৭ অগস্ট ‘দ্য ওয়াল’-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়ও খরাজ জানিয়েছিলেন, শুটিং শেষ হয়ে গেলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কলকাতায় ফিরতে পারছেন না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী প্রতিভা। একই ছবির শুটিং করতে গিয়ে নেপালে আটকে ছিলেন অভিনেতা রজতাভ দত্তও।
নেপালের চিন সীমান্ত লাগোয়া রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ হড়পা বান ও ফ্ল্যাশ ফ্লাডের জেরে পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রাস্তা, সেতু এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। যোগাযোগ ব্যবস্থাও কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতেই শুটিং শেষ করে কলকাতায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন খরাজ।
তাঁর মূল পরিকল্পনা ছিল কাঠমান্ডু পৌঁছে সেখান থেকে নির্ধারিত বিমানে কলকাতায় ফেরা। কিন্তু রাস্তা বন্ধ থাকায় সময়মতো কাঠমান্ডু পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছিল না। ২৭ অগস্ট ‘দ্য ওয়াল’-এর তরফে ফোনে যোগাযোগ করা হলে খরাজ বলেছিলেন, “ঠিকই আছি। আমাদের শুটিং ছিল। শুটিংটা শেষ করে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফিরতে পারলাম না। কাল সকালে কাঠমান্ডু থেকে ফ্লাইট ছিল, কিন্তু রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই ফ্লাইট ধরতে পারব না।”
তখনই শুরু হয় বিকল্প পথে ফেরার পরিকল্পনা। কলকাতায় ফেরা জরুরি হওয়ায় সড়কপথে গোরক্ষপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখান থেকে কলকাতার সরাসরি বিমান ধরার চেষ্টা করার কথা জানিয়েছিলেন অভিনেতা। কিন্তু ২৭ অগস্ট সেই উড়ান না থাকায় অপেক্ষা করতে হত ২৮ তারিখ পর্যন্ত।
খরাজের কথায়, “কলকাতায় যাওয়াটা খুবই জরুরি। তাই আমরা প্ল্যান করছি গোরক্ষপুর চলে যাব। গোরক্ষপুর থেকে কলকাতার একটা ডাইরেক্ট ফ্লাইট আছে। সেটা ধরব। কিন্তু সেটা ২৭ তারিখে নেই, ২৮ তারিখে আছে।শেষ পর্যন্ত ২৮ তারিখেই সেটা ধরে ফিরতে হবে।”
শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনাই কাজে এল। গোরক্ষপুর পৌঁছে সেখান থেকে স্ত্রী প্রতিভাকে সঙ্গে নিয়ে বিমানে কলকাতায় ফিরলেন অভিনেতা। ফলে ২৭ অগস্ট যে অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, ২৮ অগস্ট এসে তার অবসান হল।
তবে বিপদটা শুধু দেশে ফেরার পথেই ছিল না। নেপালের প্রতিকূল আবহাওয়া শুটিংয়ের কাজেও একের পর এক বাধা তৈরি করেছিল। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন খরাজ এবং তাঁর সহকর্মীরা। কিন্তু বৃষ্টির তীব্রতায় বারবার শুটিং বন্ধ রাখতে হচ্ছিল।
সেই পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে খরাজ জানিয়েছিলেন, “অসম্ভব বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই কাজ করছি, শুটিং করছি। শুটিং আটকে যাচ্ছে, নানা রকম সমস্যা আছে। সেসব নিয়েই চলছি।”
২০ অগস্ট নেপালে পৌঁছেছিলেন খরাজ। তখন পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবহাওয়ার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। প্রবল বৃষ্টি, রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শেষ পর্যন্ত হোটেলেই থাকতে হয় খরাজ, তাঁর স্ত্রী এবং শুটিং দলের সদস্যদের।
এর মধ্যেই বুধবার রাসুয়া জেলার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তিব্বত থেকে নেমে আসা ভোতে কোশি নদীতে আচমকা জলস্তর বেড়ে গিয়ে তৈরি হয় ফ্ল্যাশ ফ্লাড। তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি-সহ একাধিক এলাকায় তার প্রভাব পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাজার, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো।
সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, রাসুয়া ও সংলগ্ন এলাকায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২ হয়েছিল। নিখোঁজ ছিলেন বহু মানুষ। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের কাজও ব্যাহত হচ্ছিল। নদী এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছিল পর্যটক ও যাত্রীদের নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে আসায়। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক তালিকায় ৩৮৪ জন পর্যটক ও যাত্রীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না বলে জানা গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় ছিলেন। নিখোঁজদের সন্ধান এবং উদ্ধারকাজে নেপাল সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীও নামানো হয়েছিল।
এই বিপর্যয়ের মধ্যেই হোটেলে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছিলেন খরাজ ও তাঁর সহকর্মীরা। যে ছবির শুটিং করতে নেপালে গিয়েছিলেন অভিনেতা, সেটি বাংলাদেশের ছবি। সেই ছবিতে অভিনয় করছেন রজতাভ দত্তও। শুটিং শেষ হয়ে যাওয়ার পরও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশে ফেরার পথ।মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে অবশ্য ছবিটা বদলে গেল। ২৭ অগস্ট খরাজের সঙ্গে
যখন কথা হয়েছিল, তখনও অনিশ্চিত ছিল তাঁর কলকাতায় ফেরার পথ। কাঠমান্ডুর বিমান ধরার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। বিকল্প হিসেবে গোরক্ষপুর হয়ে ফেরার পরিকল্পনাই তখন ভরসা ছিল। আর ২৮ অগস্ট সেই পথেই কলকাতায় ফিরলেন অভিনেতা।
নেপালের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময় নিশ্চয়ই ভাবেননি, একটি শুটিং সফর এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করবে তাঁকে। ২০ অগস্ট যখন সেখানে পৌঁছেছিলেন, পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। কয়েক দিনের মধ্যে বদলে গেল সবকিছু। প্রবল বৃষ্টি, ফ্ল্যাশ ফ্লাড, বন্ধ রাস্তা, বিপর্যস্ত যোগাযোগ এবং দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা ঘিরে তৈরি হয়েছিল উদ্বেগ।
এখন অবশ্য সেই উদ্বেগ অনেকটাই কেটেছে। খরাজ মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী প্রতিভা নিরাপদে কলকাতায় ফিরেছেন। সামনে আবার কাজ, শুটিং এবং দর্শকদের জন্য নতুন ছবি নিয়ে ফেরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন অভিনেতা। কিন্তু যে সফর শুরু হয়েছিল শুধুই একটি ছবির শুটিংকে কেন্দ্র করে, সেটি শেষ হল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বাড়ি ফেরার এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়। নেপালের সেই কয়েকটা দিন কি এবার খরাজের কাছে শুধু শুটিংয়ের স্মৃতি হয়ে থাকবে, নাকি জীবনের এক গভীর শিক্ষা হয়ে থেকে যাবে?
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)