'প্রতিবাদ চলাকালীন হিংসা রুখতে তরুণদের কথা শুনুক রাষ্ট্র', 'সংসদ চলো' মামলায় জানাল সুপ্রিম কোর্ট
বেঞ্চের মন্তব্য, "তরুণদের শান্ত করা ও কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। ‘সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র’-এর নামে তাঁদের ওপর কোনও আগ্রাসী বা কঠোর পদক্ষেপ করা হলে পরিস্থিতি অনাবশ্যকমাত্রায় জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং হিংসা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেকোনও মূল্যেই এই প্রবণতা এড়ানো দরকার।"
যেকোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হিংসা থামানোর জন্য সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী হাতিয়ার হল তরুণ প্রজন্মের কথা শোনা এবং তাদের বোঝানো। শক্তির দম্ভ দেখিয়ে তাদের দমন করতে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে - বুধবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরল সুপ্রিম কোর্ট।
রাজধানী দিল্লিতে গত ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘সংসদ চলো’ অভিযানের সময়ে ছড়িয়ে পড়া চরম বিশৃঙ্খলা ও হিংসার ঘটনায় আয়োজকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে শীর্ষ আদালতে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল। ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ আবেদনটি শুনতে সম্মত হয়েছে। এর পাশাপাশি, ছাত্র আন্দোলন ও তা দমন করতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ সংক্রান্ত যে একগুচ্ছ মামলা আগেই বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলির সঙ্গেই এই নতুন আর্জিটিকে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতিরা।
আয়োজক ও তাণ্ডবকারীদের শাস্তির দাবিতে মামলা
সুপ্রিম কোর্টে এই নতুন আবেদনটি জমা দিয়েছেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রাক্তন আধিকারিক মণীশ সোলাঙ্কি। তাঁর দাবি, গত ২০ জুলাইয়ের তাণ্ডবের জন্য আন্দোলনের আয়োজকদের এবং হিংসায় জড়িতদের জবাবদিহি করতে হবে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। আবেদনের আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব হিংসা বা গোলমালের মামলা দায়ের হয়েছে, শুধুমাত্র কোনো রাজনৈতিক দর কষাকষির ভিত্তিতে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারগুলি যেন সেগুলি ঢালাওভাবে প্রত্যাহার না করে নেয়।
একই সঙ্গে, যাঁরা পুলিশ বা নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে কটু মন্তব্য বা অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে তাঁদের দিয়ে বাধ্যতামূলক 'কমিউনিটি সার্ভিস' বা সমাজসেবামূলক কাজ করানোর নির্দেশ দেওয়ার আর্জিও জানানো হয়েছে।
শুনানি চলাকালীন আবেদনকারীর আইনজীবী রিজওয়ান আহমেদ আদালতে সওয়াল করে বলেন, সরকার এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা হলেও, এই তাণ্ডবের মূল উদ্যোক্তারা কিন্তু কোনও আইনি জাঁতাকলে না পড়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, "১৫ দিন কেটে গিয়েছে। একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকায় চরম নৈরাজ্য তৈরি করার পর সেই আয়োজকরা এখন নিশ্চিন্তে এক টিভি চ্যানেল থেকে অন্য টিভি চ্যানেলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, উস্কানিমূলক ভাষণ দিচ্ছেন এবং আগুন জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এই মুহূর্তে সরকার হয়তো কিছুটা রক্ষণাত্মক ব্যাকফুটে রয়েছে, কিন্তু সমাজ বা দেশের শীর্ষ আদালত তা থাকতে পারে না।"
জবাবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ইঙ্গিত দেয়, এই বিষয়টিও আদালতে বিচারাধীন অন্যান্য বৃহত্তর মূল মামলাগুলির সঙ্গেই খতিয়ে দেখা হবে। বেঞ্চ মন্তব্য করে, "যেহেতু এই সংক্রান্ত আরও অনেক যুক্তিনির্ভর বিষয় আমাদের বিবেচনাধীন রয়েছে, তাই এটি ওই মূল মামলার সঙ্গেই শোনা যুক্তিযুক্ত। সব রকমের পরামর্শ, মতামত এবং ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি শোনার জন্য আমরা প্রস্তুত।"
সংঘাত নয়, প্রয়োজন ধৈর্য ও সংযম
আবেদনকারীর আইনজীবী যখন মামলাকারীদের বিরুদ্ধে নোটিস জারির জোর দাবি জানান, তখন সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করে যে তরুণ আন্দোলনকারীদের সামলানোর ক্ষেত্রে সংঘাত নয়, বরং চরম ধৈর্য ও সংযমের পথ বেছে নেওয়া দরকার।
বেঞ্চের মন্তব্য, "তরুণদের শান্ত করা ও কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। ‘সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র’-এর নামে তাঁদের ওপর কোনও আগ্রাসী বা কঠোর পদক্ষেপ করা হলে পরিস্থিতি অনাবশ্যকমাত্রায় জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং হিংসা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেকোনও মূল্যেই এই প্রবণতা এড়ানো দরকার।"
অন্যদিকে, আবেদনকারীর আইনজীবী রিজওয়ান আহমেদ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, শুধু রাজনৈতিক সুবিধার্থে অপরাধের মামলা তুলে নেওয়া হলে ইট-বৃষ্টি করা দুষ্কৃতীরা পার পেয়ে যাবে, যা কোনওভাবেই হতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি আদালতকে বলেন, "আমরা কমিউনিটি সার্ভিস বা সামাজিক সেবার পক্ষে সওয়াল করছি। কিন্তু যাঁরা পাথর ছুড়েছেন, তাঁদের এভাবে ছাড় দেওয়া যায় না। গতকালও রাজস্থানে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে, কাল এটা যেকোনও জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক এক নজির তৈরি করবে। দিল্লির এনসিটি সরকার পিছু হটছে, আর এটা দেখে অন্য রাজ্যগুলিতেও এই ক্ষতিকর প্রবণতা তৈরি হতে পারে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ২০ জুলাইয়ের সেই মিছিলের কোনও বৈধ অনুমতি ছিল না এবং আন্দোলনের ২২টি শর্ত ভাঙা হয়েছিল। আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন, "যে সংগঠনটির কোনও রেজিস্ট্রেশন পর্যন্ত নেই, তাদের কীভাবে মিছিল করে গণতন্ত্রের মন্দির সংসদের দিকে যেতে দেওয়া হল? কে গ্যারান্টি দিতে পারত যে ওই ভিড়ের মধ্যে কারও কাছে দেশি পিস্তল বা বোমা ছিল না?"
এর জবাবে শীর্ষ আদালত স্মরণ করিয়ে দেয়, যেকোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শুরুটা শান্তিপূ্র্ণ হওয়া উচিত। তবে ছোটখাট বা বিচ্ছিন্ন কোনও অঘটন ঘটে গেলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে হবে। বিচারপতিরা জোর দিয়ে বলেন, "গণতান্ত্রিক আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবেই শুরু হওয়া আবশ্যক। যদি কিছু ঘটনা চলেও আসে, তাহলেও বাহিনীর অনেক সংযম দেখানো দরকার, যাতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে না যায়। যেখানেই এমন ঘটনা ঘটছে, আমাদের খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে, যাতে কোনওঁভাবেই তরুণরা হিংসায় জড়িয়ে না পড়েন।"
'কথা শোনো, বোঝো' - দাওয়াই আদালতের
সংযমের বার্তা দেওয়ার পর আদালত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে কীভাবে তরুণদের ক্ষোভের প্রশমন ঘটানো সম্ভব। শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণ করে, "সবচেয়ে ভাল পথ হল তাদের বোঝানো, কাউন্সেলিং করা। এই বিশ্ব সংসারের সবচেয়ে শক্তিশালী বল হল শোনা... তরুণদের কথা শুনুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন তারা কেন সেখানে জড়ো হয়েছে।"
আইনগত দিক খতিয়ে দেখলেও, পুলিশ বা অন্য বলপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের একদম গ্রাউন্ড লেভেলে (ground reality) সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনও হস্তক্ষেপ করা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, "মাঠের পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে তা আইন রূপায়ণকারী সংস্থাগুলির ওপরই ছেড়ে দেওয়া ভাল। তারা পরিস্থিতি ভাল বোঝে। তবে আমরা সব পক্ষ ও সব মত শুনব, সরকারকেও এই বিষয়ে তাদের জবাব জানাতে বলা হচ্ছে।"
উল্লেখ্য, দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা নিট (NEET) পরীক্ষা সংক্রান্ত বিতর্কের কারণে সৃষ্ট একাধিক মামলার সাথেই এই আবেদনের পরবর্তী শুনানি হবে।
২০ জুলাইয়ের 'সংসদ চলো' তাণ্ডবের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে শীর্ষ আদালতের এই সুনির্দিষ্ট অবস্থান আদালতের আগের নির্দেশনারই ধারাবাহিক অংশ। গত সোমবার এই একই বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, আইন অনুযায়ী যোগ্য বা লঘু অপরাধে যুক্ত ছাত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা রাজ্যগুলি প্রত্যাহার বা বন্ধ করতেই পারে, আদালত তাতে বাধা দিচ্ছে না। তবে যাঁরা ‘গম্ভীর এবং নৃশংস’ অপরাধে যুক্ত, তাঁরা আদালতের এই রক্ষাকবচ বা ছাড় পাবেন না।
আদালত আরও জানিয়েছিল, তরুণ শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর যেন সর্বক্ষণ এফআইআর (FIR)-এর খাঁড়া না ঝোলে, তার জন্যই তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অপেক্ষাকৃত হালকা মামলাগুলি প্রত্যাহারে সাহায্য করা হচ্ছে। কিন্তু খুন, ধর্ষণ বা অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের এই সুযোগ দেওয়া হবে না।
একই সাথে শীর্ষ আদালত ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে, প্রত্যাহার না হওয়া মামলাগুলির তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হতে পারে। পাশাপাশি, পুলিশ বা আন্দোলনকারী - কারও তরফ থেকেই যাতে কোনও অতিরিক্ত হিংসা বা অবিচার নজর এড়িয়ে না যায়, তার জন্য হাইকোর্টের প্রাক্তন কোনও বিচারপতির নেতৃত্বে একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গড়ার ভাবনাও রয়েছে আদালতের। এমনকি ভিড় সামলাতে পুলিশ যাতে যত্রতত্র ‘পেলেট গান’ ব্যবহার না করতে পারে, সে বিষয়েও দেশব্যাপী একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)