World Cup 2026: ‘মেরে পাস মা হ্যায়!’ আর তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে 'ব্রাউট' পদবিতে গর্বিত নরওয়ের গোলমেশিন

ম্যানচেস্টার সিটির জার্সি গায়ে শুধু 'হালান্ড' হলেও নরওয়ের হয়ে বিশ্বকাপে তাঁর জার্সিতে লেখা 'ব্রাউট হালান্ড'। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই কেন এমন অভিনব সিদ্ধান্ত নিলেন এই মহাতারকা?

Jul 06, 2026 - 17:28
0 0
World Cup 2026: ‘মেরে পাস মা হ্যায়!’ আর তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে 'ব্রাউট' পদবিতে গর্বিত নরওয়ের গোলমেশিন

চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। এতদিন ক্লাব ফুটবলে নজর কেড়েছেন৷ এবার চলতি আসরে ৭ গোল করে গোটা দুনিয়ার ফোকাসে দীর্ঘকায় তারকা।

অতিসম্প্রতি মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে জোর চর্চা। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলার সময় তাঁর জার্সির পেছনে শুধু 'হালান্ড' লেখা থাকলেও, ২০০০ সালের পর নরওয়ের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নেমে তাঁর জার্সির পেছনে জ্বলজ্বল করছে 'ব্রাউট হালান্ড'। কিন্তু কেন?

আসলে 'ব্রাউট' হচ্ছে হালান্ডের মা, প্রাক্তন পেশাদার হেপ্টাথলিট গ্রাই মারিতা ব্রাউটের পারিবারিক পদবি। তাঁর বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড। প্রিমিয়ার লিগের প্রাক্তন ডিফেন্ডার। আইনগতভাবে এই ২৫ বছর বয়সি তারকার পুরো নাম আর্লিং ব্রাউট হালান্ড। নরওয়েতে মাতৃবংশের পদবিকে মধ্যনাম বা মিডল নেম হিসেবে ব্যবহারের প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে, যার উদ্দেশ্য মায়ের পরিবারের পরিচয়কে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা।

বস্তুত, মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা চলতি বছরের শুরুতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র কাছেও স্বীকার করেছিলেন হালান্ড। ২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর ট্রফি হাতে মায়ের সঙ্গে তাঁর ছবিটি বেশ ভাইরালও হয়৷ 

নরওয়েজিয়ান ঐতিহ্য এবং পরিবর্তনের নতুন ধারা

আন্তর্জাতিক মঞ্চে মাতৃপদবি মেলে ধরার ঘটনা হালান্ডের কেরিয়ারে অবশ্য এটাই প্রথম নয়। কেরিয়ারের একদম শুরুর দিনগুলোতে তিনি এই জোড়া পদবি ব্যবহার করতেন, পরে বিষয়টিকে শিথিল ও সহজ করার জন্য 'ব্রাউট’ শব্দটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত৷ তবে দেশের হয়ে খেলার সময় হালান্ড তা ফিরিয়ে আনেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শুরুর দিকে এস্তেনিয়া বা ইতালির বিরুদ্ধে ম্যাচে তাঁর জার্সিতে কেবল 'হালান্ড' লেখা থাকলেও গত গ্রীষ্মে ফিরতি ম্যাচগুলোর সময় তিনি 'ব্রাউটে'ই সরে যান।

এহেন নামকরণ-রীতির নেপথ্য-বিজ্ঞান খোলসা করে ইউনিভার্সিটি অব বারগেনের ভাষাতত্ত্বের প্রাক্তন অধ্যাপক ইভার উতনে বলেছেন, 'নরওয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের মধ্যনাম আসে তাঁদের মায়ের বংশের উত্তরাধিকার থেকে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অনেক নরওয়েজিয়ান আন্তর্জাতিক স্তরে সুবিধার জন্য নাম ছোট করলেও দেশের মাটিতে পুরো নামই ব্যবহার করেন।'

সামাজিক পরিবর্তনের স্পষ্ট ব্যাখ্যায় লেখক লিভ বার্গিট ক্রিস্টেনসেনের সংযোজন, 'হালান্ডের কাছ থেকে এ এক চমৎকার বার্তা, কারণ নরওয়েতে অনেক সময়ই মধ্যনামগুলো মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু ও দেশের হয়ে খেলার সময় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে।'

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৫ সালে যেখানে ৬৮ শতাংশ নারী বিয়ের পর স্বামীর পদবি নিতেন, এখন সেখানে মাত্র ৪৬ শতাংশ নারী স্বামীর পদবি নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের কুমারীকালীন পদবিটিকে মধ্যনাম হিসেবে রেখে দিচ্ছেন।

একই পথের পথিক সতীর্থ আইয়েরও

নরওয়ে দলে মায়ের ঘরের পদবি জার্সির পেছনে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে হালান্ড একমাত্র ব্যতিক্রম নন। সতীর্থ তথা ব্রেন্টফোর্ডের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আইয়েরও হুবহু একই পথ বেছে নিয়েছেন। ক্লাবের জার্সিতে শুধু 'আইয়ের' লিখলেও দেশের হয়ে মাঠে নামার সময় তাঁর জার্সিতে লেখা থাকে 'ভাসবাক আইয়ের'। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর থেকেই এই নাম ব্যবহার করছেন। আসলে 'ভাসবাক' হলো তাঁর মাতামহ বা দাদুর পদবি, যিনি ২০১৭ সালে প্রয়াত হন। দাদুর স্মৃতিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অমর করে রাখতেই আইয়েরের এমন অভিনব প্রয়াস। তাঁর পুরো নাম ক্রিস্টোফার ভাসবাক কপ আইয়ের।

নরওয়ের ফুটবলারদের এই পারিবারিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা ফুটবল বিশ্বের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা প্রমাণ করে গ্লোবাল ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার পরও তাঁরা নিজেদের শিকড়কে কতটা মর্যাদা দেন।

লিডসে জন্ম নিয়েও ভাইকিংদের প্রতি অটুট ভালোবাসা

২০০০ সালে ইংল্যান্ডের লিডসে জন্ম নেওয়ার সুবাদে হালান্ডের সামনে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলার সহজ সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে নরওয়েকেই বেছে নেন। তাঁর বাবা আলফ-ইঙ্গে দেশের হয়ে ৩৪টি ম্যাচ খেলেছিলেন। চার বছর বয়স থেকেই হালান্ডের নরওয়েতে বসবাস শুরু এবং অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায় থেকে তারপর প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলেই নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

দেশের প্রতি তাঁর এই নিখাদ ভালোবাসার প্রমাণ মেলে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। ক্লাব মরশুম শেষ হওয়ার পর থেকে নরওয়েকে নিয়ে ইনস্টাগ্রামে অন্তত ৩৪টি পোস্ট করেছেন তিনি। বিশ্বফুটবলে 'হালান্ড' আজ এক পরিচিত গ্লোবাল ব্র্যান্ড। তবু জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, দেশের গৌরব বাড়াতে মাঠে নামার সময় তিনি বিশ্ববাসীকে নিজের নাম হিসেবে 'ব্রাউট হালান্ড' দেখাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ৷

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User