World Cup 2026: ক্রিকেটের ‘স্নিকো’ এবার ফুটবলে! খুদে চিপ কীভাবে ধরল ক্রোয়েশিয়ার সূক্ষ্মতম অফসাইড?
ক্রিকেটের স্নিকোমিটারের মতো প্রযুক্তি এবার ফুটবলেও। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্যবহৃত চিপযুক্ত বল কীভাবে বদলে দিচ্ছে অফসাইড এবং গোল লাইনের সিদ্ধান্ত, জেনে নিন সহজ ভাষায়।
ক্রিকেটের বাইশ গজে ব্যাটের কানায় বল লেগেছে কি না, ধরতে 'স্নিকোমিটার' বা আল্ট্রা এজের ব্যবহার বেশ পুরনো। এবার ঠিক একইরকম প্রযুক্তি চমকে দিচ্ছে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ (FIFA World Cup 2026)। পর্তুগালের বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়ার শেষ বত্রিশের নকআউট ম্যাচে দেখা গেল এর নিখুঁত প্রয়োগ (Portugal vs Croatia)। লড়াইয়ের শেষ মুহূর্তে জোসকো গভার্দিওল গোল করে সমতা ফেরান। কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর পরীক্ষার পর রেফারি এস্পেন এসকাস গোল বাতিল করেন। কারণ পরীক্ষা করে দেখা যায়, গভার্দিওলের সতীর্থ মারিও পাসালিচ বলটি রিসিভের সময় অফসাইড পজিশনে। আর পাসালিচের কাছে বলটি যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ইগর মাতানোভিচের বুটে বলটি সামান্য ফ্লেক বা স্পর্শ করেছিল।
খালি চোখে এই সূক্ষ্ম স্পর্শ ধরা না গেলেও, টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায় বলের ভেতরের চিপের কারণে গ্রাফে একটি 'স্পাইক' বা কম্পন তৈরি হয়। যা নিশ্চিত করে বলের গায়ে কার টাচ করেছিল।
রোনাল্ডোর বিতর্ক থেকে সুইডেনের গোল
চলতি বিশ্বকাপে এই ধরনের ঘটনা অবশ্য প্রথম নয়। গ্রুপ পর্বে তিউনিশিয়ার বিরুদ্ধে সুইডেনের ৫-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচেও ত্রাতা এই আধুনিক প্রযুক্তি (Sweden vs Tunisia)। পরিবর্ত হিসেবে নামার মাত্র ১৮ সেকেন্ডের মাথায় সুইডিশ মাত্তিয়াস সভানবার্গ বল জালে জড়ান। ইয়াসিন আয়ারির ফ্রি-কিক থেকে যখন বলটি ভেসে আসে, সভানবার্গ তখন অফসাইড পজিশনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সুইডেন দলের দাবি ছিল, সভানবার্গের কাছে পৌঁছনোর আগে তাদের অন্য সতীর্থ আলেকজান্ডার ইসাক বলে পা ছোঁয়ান, যার ফলে অফসাইডের আওতা থেকে রেহাই জোটে সভানবার্গের। রেফারি ইয়ায়েল ফ্যালকন বাধ্যত প্রযুক্তির সাহায্য নেন এবং দেখা যায়, ইসাকের বুট বল স্পর্শ করেছিল। ফলে গোল বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়।
এই একই প্রযুক্তি গত বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর একটি গোলের দাবি নাকচ করে! উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ব্রুনো ফার্নান্দেজের একটি ক্রসে সিআরসেভেনের দাবি, বল তাঁর মাথা ছুঁয়ে গিয়েছে। কিন্তু ডেটা জানায় সেখানে কোনও 'হার্টবিট' বা বাহ্যিক কম্পন তৈরি হয়নি। ফলে গোলটি ব্রুনোর খাতায় যায়।
চিপের ভেতরে লুকিয়ে আসল রহস্য
সাধারণ পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, একটি ফুটবল কীভাবে এই ধরনের নিখুঁত তথ্য দেয়? একশব্দে উত্তর: ট্রিওন্ডা!
ফিফার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সহযোগী অ্যাডিডাস চলতি বিশ্বকাপে এই নামে সমস্ত বল তৈরি করেছে। কাতার বিশ্বকাপ থেকে বিখ্যাত সংস্থাটি বলের ভেতরে ৫০০ হার্টজের একটি মোশন সেন্সর বা খুদে চিপ বসিয়ে আসছে। এই প্রযুক্তিকে বলা হয় 'কানেক্টেড বল টেকনোলজি'। জার্মানির প্রযুক্তি সংস্থা 'কিনেক্সন'-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেন্সর তৈরি। যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য পাঠাতে সক্ষম। যখনই কোনও খেলোয়াড়ের পা বা মাথা বলটিকে টাচ করে, তখনই এই চিপে একটি বাহ্যিক বল বা ধাক্কা অনুভূত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে রেফারিদের কাছে তথ্য পৌঁছে যায়।
শুধু অফসাইড বা সূক্ষ্ম স্পর্শ ধরাই নয়, বলটি কত গতিতে ছুটছে তাও নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে এই চিপ। যেমন, তিউনিশিয়ার বিরুদ্ধে ইয়াসিন আয়ারির দুটি গোলের গতিবেগ এই চিপের মাধ্যমে জানা গিয়েছে, যথাক্রমে ১২০ কিলোমিটার ও ১১৮ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। ইউরো ২০২৪-এ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও, ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ খেলা হয়য় পুমার বলে। ফলে সেখানে এখনও এই চিপের ব্যবহার শুরু হয়নি।
স্বচ্ছতা বনাম মাঠের নাটক
মাঠে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য ফিফা এখন টেলিভিশনের পর্দায় দর্শকদের এই গ্রাফটি সরাসরি দেখায়, যা দেখতে অবিকল মানুষের হৃদস্পন্দন মাপার কার্ডিয়াক মনিটরের মতো (World Cup Knockout Stage)। বল পায়ে লাগার মুহূর্তে সেখানে একটি উঁচু 'স্পাইক' বা দাগ ভেসে ওঠে। ক্রিকেটের স্নিকোমিটার মূলত উইকেটের নিচে থাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল মাইক্রোফোনের শব্দের উপর নির্ভর করে কাজ করে, কিন্তু ফুটবলের ক্ষেত্রে সেন্সরটি থাকে সরাসরি বলের ঠিক মাঝখানে।
গত অ্যাশেজ সিরিজে ক্রিকেটের এই স্নিকোমিটার নিয়ে বেশ বিতর্ক জমেছিল, কারণ বল ব্যাট পার হওয়ার সময়ের সঙ্গে গ্রাফের টাইমিং মেলেনি। তবে ফুটবলের এই চিপ প্রযুক্তি অনেক বেশি নির্ভুল। অবশ্য ক্রিকেটে যেমন ডিআরএস নেওয়ার সময় মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনে দর্শকদের টানটান উত্তেজনা নিয়ে স্নিকোমিটারের গ্রাফ দেখতে দেওয়া হয়, ফুটবলে তা হয় না। ফিফা সাধারণত গোল বা অফসাইডের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পরেই গ্রাফটি সম্প্রচারে দেখায়। ফলে বাইশ গজের যুদ্ধের মতো নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি না হলেও, রেফারিদের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনও বিতর্কের অবকাশ থাকে না।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)