আজ গভীর রাতে মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছে GSLV-F17, 'নটি বয়'-এর কাঁধে ভর করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ইসরোর
আজ রাতে শ্রীহরিকোটা থেকে জিএসএলভি-এফ১৭ রকেটের মাধ্যমে 'ইওএস-০৫' স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে চলেছে ইসরো। সাম্প্রতিক ব্যর্থতা কাটিয়ে একগুঁয়ে 'নটি বয়' রকেটের ওপর ভর করে মহাকাশে কি ফের ঘুরে দাঁড়াবে ভারত? পড়ুন বিস্তারিত।
৪ সেপ্টেম্বর রাত ঠিক ২টো ৫৫ মিনিটে যখন প্রায় গোটা দেশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে, তখন শ্রীহরিকোটার দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে তৈরি হবে এক নতুন ইতিহাস (ISRO launch tonight)। অন্ধকারের বুক চিরে মহাকাশের উদ্দেশে রওনা দেবে ভারতের ভূ-সমলয় উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যান (মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট পাঠানোর জন্য ভারতের একটি শক্তিশালী রকেট) বা 'জিএসএলভি-এফ১৭' (GSLV-F17)। সঙ্গে নিয়ে যাবে ৩৬ হাজার কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থানকারী ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট 'ইওএস-০৫' (EOS-5)। পরপর কয়েকটি ব্যর্থতার পর ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর (ISRO) জন্য এই মিশন স্রেফ একটি উৎক্ষেপণ নয় (ISRO Naughty Boy rocket), বরং হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা (ISRO comeback mission)।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরোর দিনগুলো খুব একটা ভাল কাটেনি। বিগত বছরগুলোতে ইসরোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য 'ওয়ার্কহর্স' রকেট পিএসএলভি (PSLV) পর পর কয়েকটি অভিযানে চরম ব্যর্থতার মুখে পড়ে। ফলে সরকারের নির্দেশে সেটিকে আপাতত বসিয়ে রেখে শুরু হয়েছে তদন্ত। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে জিএসএলভি-র এই যাত্রা ইসরোর আত্মবিশ্বাস ফেরানোর অন্যতম বড় সুযোগ।
অবশ্য প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিএসএলভি এবং জিএসএলভি সম্পূর্ণ আলাদা গোত্রের। ইঞ্জিনের গঠন বা চালিকাশক্তির ক্ষেত্রে এদের মধ্যে কোনও সরাসরি যোগাযোগ নেই। ফলে পিএসএলভির সমস্যা জিএসএলভির উপর প্রভাব ফেলবে না- এই ভাবনাই এখন ইসরোর বিজ্ঞানীদের একমাত্র ভরসা।
তবে জিএসএলভি রকেটকে ঘিরে সংশয় কিন্তু একেবারে নতুন নয়। ইসরোর অন্দরেই এই রকেটের একটি বেশ চর্চিত ডাকনাম রয়েছে- 'নটি বয়' (Naughty Boy) বা একগুঁয়ে ছেলে! প্রাথমিক ও উন্নয়নমূলক দিনগুলোতে চরম অনিশ্চিত আচরণের জন্যই এর এমন নামকরণ। বিগত ১৮টি উড়ানের মধ্যে অন্তত ৬টিতেই আশানুরূপ সাফল্য মেলেনি। স্বভাবতই, পিএসএলভি যেখানে অনায়াসে সাফল্য আনত, সেখানে জিএসএলভির প্রতিটা উৎক্ষেপণ মানেই ছিল বুকের ভিতর ধুকপুকানি।
তা সত্ত্বেও এই 'নটি বয়'-ই কিন্তু ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার অন্যতম মুকুট। এর কারণ হল রকেটের প্রাণকেন্দ্রে থাকা 'ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন,' যা রকেট বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তিগুলোর একটি। নব্বইয়ের দশকে ভারত যখন রাশিয়ার কাছ থেকে এই প্রযুক্তি নেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতির অজুহাতে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বড় বড় আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে একপ্রকার থমকে গিয়েছিল ভারতের স্বপ্ন।
কিন্তু ভারত দমে যায়নি। সেই কঠিন ভূ-রাজনৈতিক চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরোর বিজ্ঞানীরা নিজেদের প্রযুক্তিতে তৈরি করেন সম্পূর্ণ দেশীয় ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন। তাই আজ রাতের এই উৎক্ষেপণ কেবল একটি উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করার লড়াই নয়, এটি ভারতের প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতা ও হার না মানা মানসিকতার এক বিরাট প্রতীক। সমস্ত নজর এখন শ্রীহরিকোটার দিকে, ইসরোর 'নটি বয়' কি পারবে নিজের দুর্নাম ঘুচিয়ে নতুন ভোরের আলো দেখাতে?
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)