উত্তম কুমারকে নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলাম, সেই আক্ষেপটা রয়ে গেল: প্রভাত রায়

উত্তম কুমারকে আমি প্রথম থেকেই খুব আকর্ষণীয় মানুষ হিসেবে দেখেছি। ওঁকে দেখলেই ভাল লাগত। শুধু চেহারা নয়, ওঁর কথা বলার ধরন, চালচলন, ব্যবহার, মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা, সব মিলিয়ে একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। তাই মানুষ ওঁর কাছে যেতে চাইত।

Sep 03, 2026 - 16:32
0 0
উত্তম কুমারকে নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলাম, সেই আক্ষেপটা রয়ে গেল: প্রভাত রায়

উত্তম কুমার নামটা শুনলেই আমার প্রথম যে কথাটা মনে হয়, সেটা হল, ওঁর মতো শিল্পী আর হয় না। অসাধারণ শিল্পী ছিলেন। শুধু অভিনয়ের কথা বলছি না, মানুষ হিসেবেও অসম্ভব ভাল ছিলেন। ওঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, ওঁর সঙ্গে অভিনয় করেছি, কাছ থেকে মানুষটাকে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।

তবে একটা আক্ষেপ আমার আজও রয়ে গেছে। উত্তম কুমারকে নিয়ে, ওঁকে ভেবেই একটা ছবি করতে চেয়েছিলাম। সেই ছবির চরিত্রটা ওঁর কথা মাথায় রেখেই লিখেছিলাম। কিন্তু ছবিটা আর ওঁকে দিয়ে করা হল না। তার আগেই উত্তম কুমার চলে গেলেন। আজ ওঁর জন্মের একশো বছর পূর্ণ হওয়ার সময়ে দাঁড়িয়ে সেই আক্ষেপটা আরও বেশি করে মনে হয়।

উত্তম কুমারকে আমি প্রথম থেকেই খুব আকর্ষণীয় মানুষ হিসেবে দেখেছি। ওঁকে দেখলেই ভাল লাগত। শুধু চেহারা নয়, ওঁর কথা বলার ধরন, চালচলন, ব্যবহার, মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা, সব মিলিয়ে একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। তাই মানুষ ওঁর কাছে যেতে চাইত। মনে হত, এই মানুষটার সঙ্গে যদি একটু সময় কাটানো যায়, যদি একটু কাছ থেকে দেখা যায়, ভালো লাগবে।

মহিলাদের মধ্যে উত্তম কুমারকে নিয়ে যে উন্মাদনা ছিল, তার কারণটা অবশ্য মহিলারাই সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। তবে আমার মনে হয়, ওঁর এই আকর্ষণটা শুধু চেহারার জন্য ছিল না। ওঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই এমন একটা ব্যাপার ছিল, যা মানুষকে টানত।

আমি উত্তম কুমারের ছবিতে সহকারী হিসেবেও কাজ করেছি, আবার ওঁর সঙ্গে অভিনয়ও করেছি। ফলে সম্পর্কটা শুধু দূর থেকে একজন তারকাকে দেখার মতো ছিল না। কাজের জায়গায় ওঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি।

আমাকে কখনও বকাঝকা করে বলেননি, ‘পাঠ মুখস্থ করেছিস কি না’। বরং আমি উল্টে ওঁকে বলতাম, ‘আমার সঙ্গে অভিনয় করতে আপনি ঘাবড়ে যাচ্ছেন না তো?’ উত্তমদা তখন হেসে বলতেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস, আমি ঘাবড়ে যাচ্ছি।’

উনি আমাকে ‘তুই’ করেই কথা বলতেন। আমিও ওঁকে উত্তমদা বলতাম। এই যে এত বড় একজন তারকা, অথচ কাজের জায়গায় একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতে পারতেন, এটাই উত্তম কুমারের একটা বড় গুণ।

‘অমানুষ’-এর সেই দিনটা আজও মনে আছে

উত্তম কুমারকে নিয়ে আমার সবচেয়ে মনে থাকা স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটা ‘অমানুষ’-এর সময়কার। আমরা সুন্দরবনে আউটডোরে গিয়েছিলাম। সেখানে উত্তমদার ঘরটা একটা উঁচু জায়গায় তৈরি করা হয়েছিল। বেশ অনেকটা উঁচুতে উঠতে হত।

সেই সময় উত্তমদার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। শরীরের অবস্থার কথাও আমরা জানতাম। তাই স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা হচ্ছিল, এতটা উঁচু জায়গায় উনি কীভাবে উঠবেন। উনি নিচে দাঁড়িয়ে বললেন, উপরে উঠতে হবে। আমি বললাম, ‘তোমার তো হার্টের অসুখ।’ কিন্তু তার পরেও বললেন, কাজটা করতে হবে। আমি তখন বলেছিলাম, অন্যভাবে করা যায় কি না। কিন্তু উনি রাজি হলেন না।

উনি ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে, খুব সাবধানে, আস্তে আস্তে উপরে উঠলেন। কিন্তু তার পরেই এমন একটা ঘটনা ঘটল, যেটা আজও আমার মনে আছে।

একটা শটে চরিত্রটাকে দৌড়ে উপরে উঠে আসতে হবে। আমি তো উত্তমদার হার্টের অসুখের কথা মাথায় রেখে ভেবেছিলাম, দৃশ্যটা একটু বদলে দেওয়া হবে। কিন্তু উত্তমদা বললেন, চরিত্রটা যেমন হওয়ার কথা, তেমনই হবে। আমার হার্টের অসুখ, মধুর (চরিত্র) তো হয়নি।’ তারপর সত্যিই উনি দৌড়ে উপরে উঠে গেলেন।

আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমি তখন মানুষটার শারীরিক অবস্থার কথা ভাবছি, আর উনি ভাবছেন চরিত্রটার কথা। একজন অভিনেতা হিসেবে চরিত্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা ছিল, সেই মুহূর্তটা তার একটা অসাধারণ উদাহরণ।

উত্তম কুমারকে ‘অভিনয় শেখানো’ নয়, একটা ছোট্ট পরামর্শ

অনেকে মজা করে বলেন, আমি নাকি উত্তম কুমারকে অভিনয় শিখিয়েছিলাম। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। উত্তম কুমারকে অভিনয় শেখানোর প্রশ্নই ওঠে না। উনি নিজেই একজন অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন। তবে ‘অমানুষ’-এর সময় একটা ছোট্ট পরামর্শ দিয়েছিলাম।

ছবিতে উৎপলদা (দত্ত) তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। আমার মনে হয়েছিল, উত্তমদার চরিত্রের জন্যও যদি ওই হাঁটার একটা ছাপ থাকে, তাহলে উৎপলদাকে নকল করাটা আরও লাগবে। আমি উত্তমদাকে বলেছিলাম, উৎপলদার মতো করে হাঁটলে কেমন হয়। উনি কথাটা শুনে বলেছিলেন, ভালো বলেছিস। শক্তিদা, প্রভা এই সাজেশনটা দিয়েছে, ভালো হয়েছে।

তারপর ছবিতে সেই হাঁটার ধরনটা দেখা গেল। এটা কোনও অর্থেই উত্তম কুমারকে অভিনয় শেখানো নয়। একজন অভিনেতাকে একটা ছোট্ট পরামর্শ দেওয়া, আর তিনি সেটা নিজের অভিনয়ের মধ্যে কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেটাই দেখেছিলাম।

যে ছবিটা উত্তম কুমারকে ভেবেই লিখেছিলাম

আমার জীবনের একটা বড় আক্ষেপের জায়গা এখানেই। আমি একটা ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম উত্তম কুমারকে ভেবেই। চরিত্রটা তৈরি করার সময় আমার মাথায় প্রথম থেকেই উত্তমদা ছিলেন। স্ক্রিপ্টটা নিয়ে ওঁর কাছে গেলাম। উনি স্ক্রিপ্টটা শুনলেন। শুনে বললেন, গল্পটা ভালো। কিন্তু এই চরিত্রটা আমার বয়সের সঙ্গে মানাবে না। চরিত্রটা একটু কম বয়সের।

আমি তখনও চেষ্টা করেছিলাম ওঁকে বোঝাতে। বলেছিলাম, ছবিটা করলে ভালো লাগবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উনি করলেন না। পরবর্তীকালে সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নাসিরউদ্দিন শাহ।

ছবিটা হয়ে গেল, চরিত্রটাও অন্য একজন অভিনেতা করলেন, কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা জায়গা থেকে গেল। কারণ আমি তো চরিত্রটা লিখেছিলাম উত্তমদাকে ভেবেই। তাই উত্তম কুমারকে দিয়ে সেই ছবিটা করতে না পারার আক্ষেপটা আমার জীবনে থেকে গেল।

আজ একশো বছরে দাঁড়িয়ে আরও বেশি মনে হয়

আজ তাঁর জন্মের একশো বছর। এত বছর পরেও যে মানুষটাকে নিয়ে কথা বলছি, সেটাই বোধহয় উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ওঁর মতো শিল্পী সত্যিই আর হয় না।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User