তিন মাস আগেই রাম মন্দিরের অনুদান চুরি টের পেয়েছিল এসবিআই! কর্মীদের ছাঁটাইয়ের দাবি শোনা হয়নি

রাম মন্দিরের এই চুরির ঘটনাটি এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। সমগ্র ঘটনার তদন্তভার যাতে রাজ্য পুলিশের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়, এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন দুই আইনজীবী।

Jun 29, 2026 - 15:29
0 0
তিন মাস আগেই রাম মন্দিরের অনুদান চুরি টের পেয়েছিল এসবিআই! কর্মীদের ছাঁটাইয়ের দাবি শোনা হয়নি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: অযোধ্যার রাম মন্দিরের কোটি কোটি টাকার অনুদান চুরির (Ayodhya Ram Mandir Theft) ঘটনায় প্রতি নিয়ত নতুন এবং অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সামনে আসছে। এবার যে বিস্ফোরক তথ্যটি প্রকাশ পেয়েছে, তা শুনে চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের। জানা যাচ্ছে, দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ‘স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’ বা এসবিআই (SBI) আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগেই এই চুরির গন্ধ পেয়েছিল। মন্দিরের দানবাক্স থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা সুপরিকল্পিতভাবে হাতানো হচ্ছে, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তখনই অনুদান গণনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের অবিলম্বে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জোরালো সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অভিযোগ, রাম মন্দির ট্রাস্টের (Ram Temple Trust Theft) ভেতরে থাকা কয়েকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা সেই সময় অপরাধী কর্মীদের বাঁচাতে কোমর বেঁধে ময়দানে নামেন। তাঁদের হস্তক্ষেপ এবং ব্যাপক চাপের কারণেই শেষ পর্যন্ত ওই চুরির সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের আর বরখাস্ত করা সম্ভব হয়নি।

এই চরম বেনিয়মের তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই পুলিশ উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রাম মন্দির ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের বয়ান রেকর্ড করেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, এই মামলায় খুব শীঘ্রই ট্রাস্টের আর এক প্রাক্তন সদস্য অনিল মিশ্র এবং গোপাল রাওকেও হাজিরার নোটিশ পাঠানো হতে চলেছে। এই কেলেঙ্কারির জেরে চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্র ইতিমধ্যেই ট্রাস্ট থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এই চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত অনুদান গণনার দায়িত্বে থাকা আটজন কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে মন্দিরের দানবাক্স থেকে চুরি যাওয়া বাকি টাকা এবং মূল্যবান সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য ম্যারাথন তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

এদিকে রাম মন্দিরের এই চুরির ঘটনাটি এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। সমগ্র ঘটনার তদন্তভার যাতে রাজ্য পুলিশের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়, এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন দুই আইনজীবী। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে সেই মামলার দ্রুত শুনানির জন্য এক জরুরি আবেদন জানানো হয়েছিল। বিচারপতি এম এম সুন্দরেষ এবং বিচারপতি শীল নাগুর বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চে এই আবেদনটি জমা পড়ে। তবে সর্বোচ্চ আদালত এই মামলার অতি দ্রুত শুনানির আর্জিটি খারিজ করে দিয়েছে। শুনানির সময় শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, এই ঘটনার তদন্তে কিছুটা দেরি হলে কারও মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে না।

ইতিমধ্যে তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, রাম মন্দির ট্রাস্টের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। মন্দিরের বিপুল পরিমাণ অনুদান গোনার গুরুদায়িত্বটি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তৃতীয় একটি এজেন্সিকে চুক্তিভিত্তিতে (আউটসোর্সিং) দিয়েছিল। প্রায় তিন মাস আগেই ব্যাঙ্কের আধিকারিকদের মনে সন্দেহ জাগে যে, টাকা গোনার সময় একটা বড় অংশ কৌশলে গায়েব করে দেওয়া হচ্ছে। সেই অনুযায়ী ওই বহিরাগত সংস্থাও অভিযুক্ত কর্মীদের কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু নথিপত্র ঘেঁটে জানা যাচ্ছে, সেই সময় ট্রাস্টের ক্ষমতার অলিন্দে থাকা চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্রের মতো হেভিওয়েট কর্তাদের অসীম প্রতিপত্তির সামনে কার্যত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। তাঁদের প্রভাব খাটিয়েই অভিযুক্ত কর্মীদের চাকরি রক্ষা করা হয় এবং ফলস্বরূপ কোনও বাধা ছাড়াই মন্দিরের গর্ভগৃহে দিনের পর দিন এই চুরি অবাধে চলতে থাকে।

এই বড়সড় কেলেঙ্কারিতে শুধু বহিরাগত কর্মীই নয়, স্বয়ং স্টেট ব্যাঙ্কের নিজস্ব দুই স্থায়ী কর্মীর নামও এবার তদন্তকারীদের আতশ কাঁচের তলায় চলে এসেছে। ব্যাঙ্কের নিজস্ব বেতনভুক এই দুই কর্মীর নাম রত্নেশ এবং গগনদীপ। টাকা গোনার পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর কড়া নজরদারি চালানোর জন্য ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এই দু’জনকে গণনা কক্ষে মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু চোরকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এই রক্ষকরাই যে চুরির অন্যতম প্রধান অংশীদার ছিল, সেই বিষয়ে পুলিশের হাতে এখন অকাট্য ও নিরেট তথ্যপ্রমাণ এসেছে। খুব শীঘ্রই এই ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে চলেছে বলে খবর।

এর আগে তদন্তে আরও জানা গিয়েছিল যে, এই সংবেদনশীল এবং অতি গোপনীয় কাজের জন্য যাদের নিয়োগ করা হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে কোনও রকম পুলিশি ভেরিফিকেশন বা চারিত্রিক শংসাপত্র যাচাই করার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। শুধুমাত্র প্রভাবশালী কর্তাদের মুখের সুপারিশের ভিত্তিতেই এদের চাকরিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ধৃত আটজন অভিযুক্তের মধ্যে অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, মণীশ কুমার যাদব, রমাশঙ্কর মিশ্র, অবনীশ এবং করুণেশ শুক্লাকে ওই এজেন্সির মাধ্যমে কাজে নেওয়া হয়েছিল। এরা প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে ট্রাস্টের শীর্ষ কর্তাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব এবং এরা সকলেই রত্নেশ ও গগনদীপের প্রত্যক্ষ নজরদারিতে কাজ করত। এদের সঙ্গে এই চক্রের মূল পান্ডা সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং তিন্নু যাদবকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

এই চরম কেলেঙ্কারি থেকে শিক্ষা নিয়ে রাম মন্দির ট্রাস্ট এবার কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যন্ত কড়া নির্দেশিকা জারি করতে চলেছে। নতুন নিয়মে যে কোনও কর্মীকে কাজে নেওয়ার আগে কঠোর স্ক্রিনিং এবং তাঁদের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক হচ্ছে। আগামী ১১ জুলাই ট্রাস্টের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, সেই বৈঠকেই এই নতুন কর্মী নিয়োগ নীতি এবং মন্দির সুরক্ষার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User