দু-দু'টি হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের লড়াইয়ে পাশে পেয়েছিলেন সলমনকে! আবেগঘন স্মৃতি রীনা রাজুর
দু-দু'টি হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের লড়াইয়ে পাশে পেয়েছিলেন সলমনকে! আবেগঘন স্মৃতি রীনা রাজুর
জীবন-মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা এক কঠিন সময়। হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার। এমন সময়ে মানসিক শক্তিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভরসা। ঠিক এমনই এক লড়াইয়ের দিনগুলোতে পাশে পেয়েছিলেন বলিউড অভিনেতা সলমন খানকে (Salman Khan)। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানালেন রীনা।
রীনা রাজু (Reena Raju)। তিনিই দেশের প্রথম ও একমাত্র অ্যাথলিট, যাঁর দু'বার সফল হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে, মোট তিন-তিনটি হৃদযন্ত্রের সহায়তায় তিনি বেঁচে আছেন!
২০০৬ সালে ধরা পড়ে, তার হৃদযন্ত্র মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ করছে। এর পরে ২০০৯ সালে, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিজের জন্মগত অসুস্থ হৃদযন্ত্র বদলে নতুন জীবন পান রীনা রাজু। এর পরেই যেন জীবনের চাকা ঘুরে যায়। স্কাইডাইভিং থেকে সাইক্লিং, দৌড়— সবেতেই নিজেকে নতুন করে খুঁজে পান তিনি। এমনকি পরবর্তীকালে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রান্সপ্ল্যান্ট গেমস’-এ অংশ নিয়ে সেই জয়ের গল্প আরও একবার লিখেছেন রীনা। আজ তিনি শুধু নিজের জন্য নন, অঙ্গদানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এবং প্রতিস্থাপন-পরবর্তী রোগীদের পাশে দাঁড়াতে গড়ে তুলেছেন একটি ফাউন্ডেশনও। এরপর ২০১৭ সালে ফের আরও একবার হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হয় তাঁর।
সলমন খানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সেই রীনা। তিনি জানান, প্রথম হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের আগে তিনি অভিনেতাকে মেসেজ করেছিলেন। তখন অস্ট্রেলিয়ায় শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও সলমন শুধু জবাবই দেননি, অস্ত্রোপচারের আগের রাতে প্রায় দু’ঘণ্টা ফোনে কথা বলে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে সাহস জুগিয়েছিলেন।
হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট কী, কতটা জটিল?
হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট বা হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন হল এমন একটি অস্ত্রোপচার, যেখানে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর হৃদযন্ত্রকে বদলে দেওয়া হয় একটি সুস্থ দাতার হৃদযন্ত্র দিয়ে। সাধারণত শেষ পর্যায়ের হার্ট ফেইলিওর, জন্মগত ত্রুটি বা গুরুতর কার্ডিয়াক রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
এই অস্ত্রোপচার অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। অপারেশনের আগে রোগীকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় উপযুক্ত ডোনারের জন্য। অপারেশনের পরও ঝুঁকি শেষ হয় না—সংক্রমণ, অঙ্গ প্রত্যাখ্যান (organ rejection), এবং দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েই বাঁচতে হয়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সমর্থন রোগীর সুস্থতায় বড় ভূমিকা নেয়।
দ্বিতীয়বার ফের হার্ট প্রতিস্থাপন দরকার হয়েছিল কেন?
প্রথম হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন সফল হলেও, কয়েক বছর পর হঠাৎ করেই রীনার শরীর আবার ভেঙে পড়তে শুরু করে। ২০১৭ সালে একদিন নিয়মিত ফলো-আপের আগে ইঞ্জেকশন নেওয়ার সময়ই তিনি আচমকা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে ওঠে যে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়।
বেঙ্গালুরু থেকে চেন্নাইয়ে হাসপাতালে পৌঁছেই আইসিইউতে ভর্তি করার পর তার প্রথম কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। চিকিৎসকরা প্রাণপণে চেষ্টা করে তাকে ফিরিয়ে আনেন, কিন্তু ততক্ষণে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা নেমে আসে মাত্র ১০ শতাংশে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে রাখা হয় ECMO (এক্সট্রা কর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন) মেশিনে, যা সাময়িকভাবে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কাজ চালিয়ে দেয়। তখনই জরুরি ভিত্তিতে ডোনার হার্টের জন্য ‘সুপরা অ্যালার্ট’ জারি করা হয়।
সৌভাগ্যক্রমে খুব দ্রুত একটি উপযুক্ত হৃদযন্ত্র পাওয়া যায়। জীবন-মৃত্যুর সেই টানাপড়েনের মাঝেই চিকিৎসকরা দ্বিতীয়বার হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করেন। অস্ত্রোপচারের পরেই রীনা জানতে পারেন—তিনি আবারও নতুন হৃদয় নিয়ে ফিরে এসেছেন জীবনের মঞ্চে।
ট্রান্সপ্লান্টের পর জীবন: নতুন চ্যালেঞ্জ
হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পর রোগীদের নিয়মিত ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ খেতে হয়, যাতে শরীর নতুন অঙ্গকে প্রত্যাখ্যান না করে। কিন্তু এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক সময় ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা বা অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিতে পারে—যেমনটা রীনার ক্ষেত্রেও হয়েছিল।
তবুও চিকিৎসকরা বলেন, সঠিক ফলো-আপ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং মানসিক দৃঢ়তা থাকলে ট্রান্সপ্লান্টের পরও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।
‘সলমন খুবই সহানুভূতিশীল’
রীনার কথায়, “অনেকেই হয়তো সলমন খানকে মেসেজ করেন, আমার মতোই। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, তিনি আমার মেসেজের উত্তর দিয়েছিলেন। পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। তিনি আমাকে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছেন।”
অস্ত্রোপচারের পর প্রায় দু’বছর যোগাযোগ না থাকলেও, ফের যোগাযোগ করলে অভিনেতা তাকে মনে রেখেছিলেন বলেও জানান রীনা। পরে নিজের ‘Light a Life’ ফাউন্ডেশনের কথা জানাতে গিয়ে তিনি আবার সালমানের সঙ্গে কথা বলেন, এবং সেখানেও একই রকম উৎসাহ পান।
প্রথম সাক্ষাৎ, তারপর স্মরণীয় সময়
২০১৮ সালে দ্বিতীয় ট্রান্সপ্লান্টের পর প্রথমবার মুম্বইয়ে সলমন খানের বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করেন রীনা। প্রথমে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হওয়ার কথা থাকলেও, তা দীর্ঘ সময়ের আড্ডায় পরিণত হয়। গান, নাচ, গল্পে কেটে যায় পুরো রাত।
রীনা জানান, সেই সময় নানা শারীরিক সমস্যার মধ্যেও তিনি মানসিকভাবে অনেকটাই চাঙা ছিলেন। পরে সলমন তাকে নিজের ছবি 'রেস থ্রি'-এর সেটেও নিয়ে যান, যেখানে তিনি একটি পুরো দিন কাটান।
এই সম্পর্কের উষ্ণতার একটি ছোট্ট উদাহরণও তুলে ধরেছেন রীনা। তিনি বলেন, একসময় মেসেজে একটি সাইকেলের কথা বলেছিলেন। পরে দেখা হলে, সলমন ঠিক মনে করে তাঁকে ‘Being Human’ ব্র্যান্ডের একটি সাদা সাইকেল উপহার দেন।
রীনার মতে, “এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়, যারা সত্যিই খেয়াল রাখেন।” এখনও কোনও শারীরিক সমস্যার মধ্যে পড়লে তিনি সলমনকে মেসেজ করেন, এবং সবসময়ই স্নেহভরা জবাব পান।
রীনা আরও জানান, তাঁর মতো বহু মানুষই সলমন খানের সাহায্য পেয়েছেন, যাদের গল্প জনসমক্ষে আসে না। তাঁর মতে, অভিনেতার এই মানবিক দিকটাই তাকে আলাদা করে তোলে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Related Posts
Security Check
Please complete the captcha to verify you are human.
Comments (0)