১৭ বছরের সন্তানের শেষকৃত্য করছিলেন বাবা! খবর এল, ছেলের হৃদয় অন্য দেহে, অঙ্গদানে বাঁচল ৬ প্রাণ
সব হারিয়েও, কিছু মানুষ আলো জ্বালিয়ে রাখেন। আকবরি পরিবার আজ সেই আলোর নীচেই দাঁড়িয়ে আছে। নিঃস্ব হয়ে, অথচ সগৌরবে।
শ্রাদ্ধের আগুন তখনও জ্বলছে। শোকের ভারে নুইয়ে পড়া পরিবার বিদায় জানাচ্ছে ১৭ বছরের ছেলেকে (17 yrs boy died)। আর ঠিক সেই সময়, শত কিলোমিটার দূরে এক অপারেশন থিয়েটারে আবারও ধকধক করে উঠছে, সেই অকালমৃত ছেলেরই হৃদয়। অন্য এক কিশোরের বুকে (Heart Transplant)।
আমদাবাদের (Ahmedabad) কিশোর কৃষ আকবরির (Krish Akbari) গল্প যেন শুধুই এক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর কাহিনি নয়। এটি অমানুষিক শোকের মাঝেও এক পরিবারের মানবিকতার সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাস (Organ Donation)।
১৭ বছরের কৃষের নির্মম পরিণতি
দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র কৃষ সেদিন বাইকে করে পড়তে যাচ্ছিল, রোজকার মতোই। পথে আচমকা ঘটে যায় অদ্ভুত এক দুর্ঘটনা। জানা গেছে, একটি নীলগাই হঠাৎ রাস্তা পেরিয়ে তার বাইকের উপর এসে পড়ে। ছিটকে পড়ে এতটাই মারাত্মক আঘাত লাগে, যে মুখে গুরুতর চোট লাগে, শুরু হয় প্রবল রক্তক্ষরণ।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে হাসপাতালে পাঠায়। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই অবস্থাতেও কৃষ নিজের মায়ের ফোন নম্বর বলে যেতে পেরেছিল। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে শরীরের লড়াই প্রায় শেষ হয়ে যায় তার।
চিকিৎসকেরা সিপিআর দিয়ে কিছু সময়ের জন্য হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনলেও, তার আর জ্ঞান ফেরেনি। পরের দিন এমআরআই রিপোর্টে স্পষ্ট হয়, কৃষের মস্তিষ্কে আর কোনও রক্ত সঞ্চালন নেই। প্রায় ২০-৩০ মিনিট অক্সিজেন না পৌঁছনোর ফলে ব্রেন সেল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ‘ব্রেন ডেথ’। শরীরের কিছু অঙ্গ কিছু সময় কাজ করলেও মানুষ আর কখনও জ্ঞানে ফেরে না।
মৃত্যুশোকেও জীবনমুখী সিদ্ধান্ত
কৃষের বাবা ডা. রবি আকবরি নিজেও চিকিৎসক। তিনি জানতেন, এই অবস্থায় আর কোনও আশার আলো নেই। তবুও সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না নিজের সন্তানের জন্য। তাঁর কথায়, 'যদি সামান্য সম্ভাবনাও থাকত ওর ফেরার, আমি পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে ওকে নিয়ে যেতাম'—বলেছেন তিনি।
অবশেষে পরিবার একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়, যখন নিজের সন্তানকে আর ফেরানো যাবেই না, তখন তার অঙ্গ অন্যের জীবন বাঁচাক। তাই হাসপাতালে দাঁড়িয়েই অঙ্গদানের কথা জানান কৃষের বাবা।
এক শরীর, ছ’জনের নতুন জীবন
এই এক সিদ্ধান্তেই বদলে যায় ছ’টি জীবনের ভবিষ্যৎ। কৃষের হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপিত হয় ভাবনগরের ১৩ বছরের এক কিশোরের শরীরে। তার ফুসফুস পায় আমদাবাদেরই ২২ বছরের এক যুবক। দুটি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয় আরও দুই কিশোরের দেহে। তার হাত প্রতিস্থাপন করা হয় ফরিদাবাদের এক ব্যক্তির শরীরে। কর্নিয়াও ফিরিয়ে দেবে কারও দৃষ্টিশক্তি।
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে শেষকৃত্যের দিনেই। ডা. আকবরি বলেন, “আমরা যখন ওর শেষকৃত্য করছি, তখনই অপারেশন থিয়েটারে ওর হৃদয় অন্য এক ছেলের শরীরে ধুকপুক করছিল। সেই অর্থে, আমার ছেলে এখনও বেঁচে আছে!”
অনন্য কোঅর্ডিনেশন
এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সম্ভব হয়েছে দেশে এগিয়ে চলা অর্গান ডোনেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঙ্গ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপন, সবকিছুই হয়েছে নির্ভুল সমন্বয়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনাটি বেসরকারি ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষ করে হাত প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার অত্যন্ত কমই হয়।
শোকের পাহাড়ে অনন্য বার্তা
ছেলেকে হারানোর যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তবুও সেই শোকের মাঝেই অন্যদের বাঁচানোর সিদ্ধান্তই এই ঘটনাটিকে আলাদা করে দেয়।
ডা. আকবরি স্পষ্ট বলেছেন, “যখন জানবেন আপনার প্রিয়জনকে আর ফেরানো সম্ভব নয়, কিন্তু তার অঙ্গ অন্যের জীবন বাঁচাতে পারে, তখন শত আবেগকে সরিয়ে রেখে, অঙ্গদানের কথা ভাবুন। অন্যের প্রাণ বাঁচান।”
এই দুর্ঘটনার পিছনে নিরাপত্তার ঘাটতির প্রসঙ্গও তুলেছেন তিনি। ব্যস্ত রাস্তায় বন্যপ্রাণীর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ জরুরি বলেই মত তাঁর।
কৃষ আর ফিরবে না। কিন্তু তার হৃদস্পন্দন থামেনি, বয়ে চলেছে অন্য এক শরীরে। তার চোখের আলো, তার শ্বাস, তার স্পর্শ— এই সবটুকু বেঁচে আছে ছ’জন মানুষের মধ্যে।
সব হারিয়েও, কিছু মানুষ আলো জ্বালিয়ে রাখেন। আকবরি পরিবার আজ সেই আলোর নীচেই দাঁড়িয়ে আছে। নিঃস্ব হয়ে, অথচ সগৌরবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)