নেপাল হড়পা বান: বুদ্ধি করে জঙ্গলে দৌড়! পা ভেঙে টুকরো হলেও গাছে চড়ে প্রাণে বাঁচল ৮ বছরের শিশু
নুয়াকোটের ১৫ শয্যার একটি ছোট হাসপাতালে যখন জয়েলকে ভর্তি করা হয়, তখন তার পরিবারের কারও হদিশ ছিল না। সেখানে পৌঁছন এক সাংবাদিক। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের আশায় ওই সাংবাদিক জয়েলকে ক্যামেরাবন্দি করেন এবং নিজের ফোন নম্বর হাসপাতালে রেখে আসেন। অন্যদিকে, ভাগ্যের জোরে ইতিমধ্যে ছোট ছেলেকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পেয়েছিলেন মা।
হড়পা বানের (Nepal Flash Flood) তোড়ে নিমেষেই চোখের সামনে ভেসে গিয়েছিল সব কিছু। নদীর পাড় উপচে উঠে আসা কাদা, পাথর আর বরফের স্তূপ গ্রাস করে নিয়েছিল স্কুলবাড়ি, ঘরদোর আর আস্ত বস্তিকে। চারিদিকে যখন শুধুই হাহাকার আর মৃত্যুর মিছিল, ঠিক সেই সময় জীবনের আশা একদম ছেড়ে দিয়েছিলেন মা। ধরে নিয়েছিলেন, যে দুই সন্তানকে সকালে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন, তারা বুঝি আর কোনওদিনই ঘরে ফিরবে না। কিন্তু জঙ্গলের ভিতর গাছে চড়ে অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচাল আট বছরের এক শিশু। এরপর এক সাংবাদিকের সামান্য একটু উদ্যোগ এবং পুলিশের ভালবাসায় ভর করে দীর্ঘ উৎকণ্ঠার অবসান ঘটল। কাঠমান্ডুর (Nepal Flood Rescue) হাসপাতালে অবশেষে মা ও সন্তানের সেই আবেগঘন মিলন দেখে চোখে জল এল চিকিৎসকদেরও।
প্লাবনের ভয়াবহতার মাঝেই ঘটে যায় এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। দুর্ঘটনার দিন সকালে প্রতিদিনের মতো স্কুলের গাড়িতে চেপে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল আট বছরের খুদে জয়েল ঘালে এবং তার ছোট ভাই। বাড়িতে বসে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন মা মাটি মায়া তামাং। হঠাৎ এক বিকট আওয়াজ, ঠিক যেন ভূমিকম্প হচ্ছে! ঘর থেকে বেরিয়ে মা দেখেন, পাহাড়ি নদী বেপরোয়া হয়ে ভেসে নিয়ে আসছে কাদা, বিশাল পাথর আর বরফ। আতঙ্কে শিউরে উঠে তিনি দৌড়ান সন্তানের স্কুলের দিকে। কিন্তু গিয়ে দেখেন, যেখানে বাজার কিংবা স্কুল থাকার কথা ছিল, সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুধুই হাঁটু সমান কাদা আর বয়ে চলা জল। পর পর চার-চারটি ত্রাণ শিবির ঘুরেও সন্তানদের নাম তালিকায় না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ২৮ বছরের ওই তরুণী মা। মনে মনে মেনেই নিয়েছিলেন, তাঁর দুই সন্তান আর বেঁচে নেই।
জঙ্গলে দৌড়, গাছে আশ্রয়
কিন্তু আসল ঘটনা ছিল অন্যরকম। স্কুলে আচমকা চারদিক যখন কালো হয়ে জল ঢুকতে শুরু করে, তখন এতটুকুও ভয় না পেয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয় জয়েল। এক সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে সে সোজা দৌড় লাগায় পাশের জঙ্গলের দিকে। প্রাণে বাঁচতে চটপট চড়ে বসে একটা উঁচু গাছে। জল নামা পর্যন্ত সেভাবেই গাছে আটকে থাকে তারা। পরে উদ্ধারকারী দল এসে তাকে উদ্ধার করে। জয়েলকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তার ডান পা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে, মুখে অজস্র আঁচড় ও আঘাতের দাগ। কিন্তু বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা ছিল দুটি ১০ টাকার নোট! আসলে হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিল দেখে উদ্ধারকারী পুলিশকর্মীরা ভালবেসে তাকে ২০ টাকা উপহার দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন।
সাংবাদিকের সাহায্য
নুয়াকোটের ১৫ শয্যার একটি ছোট হাসপাতালে যখন জয়েলকে ভর্তি করা হয়, তখন তার পরিবারের কারও হদিশ ছিল না। সেখানে পৌঁছন এক সাংবাদিক। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের আশায় ওই সাংবাদিক জয়েলকে ক্যামেরাবন্দি করেন এবং নিজের ফোন নম্বর হাসপাতালে রেখে আসেন। অন্যদিকে, ভাগ্যের জোরে ইতিমধ্যে ছোট ছেলেকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পেয়েছিলেন মা। কিন্তু বড় ছেলের কোনও হদিশ পাচ্ছিলেন না। রসুয়ার এক পরিচিতের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ওই সাংবাদিককে ফোন করতেই মা জানতে পারেন - তাঁর জয়েল বেঁচে আছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিমানে করে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে!
বাস যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ওই সাংবাদিকেরই পাঠানো গাড়িতে চেপে তড়িঘড়ি কাঠমান্ডু পৌঁছন তামাং। শুক্রবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা জয়েলকে দেখে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তিনি। বুকে পাথর চেপে বসে থাকা মা এক ধাক্কায় যেন আবার নতুন করে জীবন ফিরে পেলেন। ছেলে যে বেঁচে ফিরবে, তা তো কল্পনাও করতে পারেননি তিনি! সমস্ত ভয়ডরকে বুড়ো আঙুল দেখানো জয়েলকে জড়িয়ে ধরে মা বলেন, "ছেলেটা বড্ড ছটফটে, এর আগেও কতবার হাড় ভেঙেছে তার ইয়ত্তা নেই!" জাপানে নির্মাণকর্মীর কাজ করা জয়েলের বাবাও খবর পেয়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং জেলাজুড়ে প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে। প্রকাণ্ড লাংটাং লিরুং পর্বতচূড়ার নীচের হিমবাহ ধসে গিয়ে নদী উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর ফলে মুহূর্তে তৈরি হয় এক ভয়াবহ তুষারধস ও ধস। যার তাণ্ডবে নেপাল থেকে শুরু করে তিব্বতের সীমান্ত পর্যন্ত এক বিশাল এলাকা কার্যত মাটির সঙ্গে মিশে যায়। চোখের পলকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যায় রসুয়া জেলার একটি নামজাদা বিদ্যালয়। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ৫৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে এবং নিখোঁজ প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। রাষ্ট্রপুঞ্জের শিশু সুরক্ষা সংস্থা বা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই বন্যায় অন্তত ১৭ হাজার শিশু গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)