হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির পাতলা খাসির ঝোল! বড় আলু আর গরম ভাতে ফিরুক রবিবারের ছোটবেলা
আজ থেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগেও রবিবার দুপুর মানেই ছিল বাঙালি বাড়ির এক চেনা ছবি। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত খাসির মাংসের ঝোলের গন্ধ। হাঁড়িতে মাংসের সঙ্গে ফুটত বড় বড় আলু। ঝোল হত পাতলা, অথচ স্বাদে গভীর। সেই ঝোল গরম ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা।
আজ থেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগেও রবিবার দুপুর মানেই ছিল বাঙালি বাড়ির এক চেনা ছবি। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত খাসির মাংসের ঝোলের গন্ধ। হাঁড়িতে মাংসের সঙ্গে ফুটত বড় বড় আলু। ঝোল হত পাতলা, অথচ স্বাদে গভীর। সেই ঝোল গরম ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা।
এখনও বাড়িতে খাসির মাংস রান্না হয়। কিন্তু সেই ঝোল যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তার বদলে তৈরি হচ্ছে ঘন মশলাদার গ্রেভি। অনেকটা পেঁয়াজ, প্রচুর গরমমশলা এবং নানা রকম মশলার চাপে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মাংসের নিজস্ব স্বাদ।
আসলে খাসির ঝোলের সৌন্দর্য তার সরলতায়। মশলার দাপট নয়, মাংস ও আলুর আসল স্বাদই সেখানে প্রধান। অথচ বাড়ির রান্নার লোক থেকে পরিবারের নতুন প্রজন্ম—অনেকেই এখন সেই সহজ ঝোলের রান্না ভুলতে বসেছেন।
মনসাপুজোর পাঁঠার ঝোলের সেই স্বাদ
মনসাপুজোর বলির পাঁঠার মাংসের কথা এখনও অনেকের মনে আছে। সেই রান্নায় পেঁয়াজ বা রসুন পড়ত না। শুধু আদা এবং কয়েকটি সাধারণ মশলা দিয়েই তৈরি হত পাতলা ঝোল। অথচ তার স্বাদ ছিল অমৃতের মতো।
ভাল খাসির ঝোল রান্না করতেও একগাদা পেঁয়াজ বা গরমমশলার প্রয়োজন নেই। বেশি মশলা দিলে মাংসের নিজস্ব গন্ধ ও স্বাদটাই হারিয়ে যায়। বরং অল্প মশলা, ধীরে কষানো এবং পরিমিত জল—এই তিনটিই পুরনো দিনের খাসির ঝোলের আসল রহস্য।
মাংস আগে থেকে দই-মশলা দিয়ে মাখিয়ে রাখারও প্রয়োজন নেই। মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে তখন দইটই দিয়ে মাংস মাখিয়ে রাখার প্যাখনা ছিল না। তাই রান্নার পদ্ধতি ঠিক থাকলে সাধারণ কয়েকটি উপকরণ দিয়েই ফিরে পাওয়া যায় ছোটবেলার সেই স্বাদ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
খাসির মাংস: ১ কেজি
আলু: ৪ থেকে ৫টি, মাঝখান থেকে অর্ধেক করা
পেঁয়াজ: মাঝারি মাপের ২টি, সরু করে কাটা
আদাবাটা: ১ টেবিল চামচ
রসুনবাটা: স্বাদমতো
টমেটো: মাঝারি মাপের ১টি
তেজপাতা: ২টি
দারচিনি: ১টি ছোট টুকরো
ছোট এলাচ: ৪টি
গোটা জিরে: ১ চিমটি
গোলমরিচ: ১ ছোট চামচ
গোটা শুকনো লঙ্কা: ৪টি
হলুদগুঁড়ো: প্রয়োজনমতো
কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো: স্বাদ ও রঙ অনুযায়ী
চিনি: ১ ছোট চামচ
নুন: স্বাদমতো
সরষের তেল: প্রয়োজনমতো
গরম জল: প্রায় ২ কাপ
সামনের রান বা পায়ের দিকের মাংস হলে সাধারণত তুলনায় দ্রুত নরম হয়। তবে মাংসের অংশ নির্বাচন একেবারেই ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।
কীভাবে রান্না করবেন
প্রথমে আলুগুলি মাঝখান থেকে অর্ধেক করে কেটে নিন। সামান্য নুন ও হলুদ মাখিয়ে সরষের তেলে হালকা সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন।
এবার একটি প্রেসার কুকার আঁচে বসান। নন-স্টিক প্রেসার কুকার হলে কষানোর সময়ে সুবিধা হবে। প্রয়োজনমতো সরষের তেল দিয়ে ভাল করে গরম হতে দিন।
তেল গরম হলে তেজপাতা, দারচিনি, ছোট এলাচ, গোটা জিরে, গোলমরিচ এবং শুকনো লঙ্কা দিয়ে দিন। মশলাগুলি থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোতে শুরু করলে সরু করে কাটা পেঁয়াজ যোগ করুন।
পেঁয়াজ সোনালি হয়ে এলে আদাবাটা ও রসুনবাটা দিন। অল্প সময় নেড়েচেড়ে কাঁচা গন্ধ চলে গেলে মাংস ঢেলে দিন।
প্রথম কয়েক মিনিট মাঝারি থেকে বেশি আঁচে মাংস নাড়তে থাকুন। তার পর হলুদগুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, স্বাদমতো নুন এবং এক ছোট চামচ চিনি দিন।
এবার ধৈর্য ধরে মাংস কষাতে হবে। অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট মাঝারি আঁচে নাড়তে থাকুন। মাংস থেকে জল বেরিয়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে তেল ছাড়তে শুরু করলে কেটে রাখা টমেটো দিয়ে দিন। টমেটো নরম হওয়া পর্যন্ত আরও কিছুক্ষণ কষান।
এর পরে আঁচ একেবারে কমিয়ে প্রেসার কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে দিন। কিন্তু তখনই সিটি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। খুব কম আঁচে প্রায় ১০ মিনিট ঢাকনা বন্ধ রেখে মাংসটিকে নিজের জলেই রান্না হতে দিন।
দশ মিনিট পরে ঢাকনা খুলে দুই কাপ গরম জল ঢালুন। ঠান্ডা জল না দেওয়াই ভাল। জল দেওয়ার পরে ঢাকনা বন্ধ করে কম আঁচে দুই থেকে তিনটি সিটি দিন।
প্রেসার কিছুটা কমলে ঢাকনা খুলে আগে থেকে ভেজে রাখা আলুগুলি যোগ করুন। আবার ঢাকনা বন্ধ করে আরও দু’টি সিটি দিন।
শেষ সিটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকারের ঢাকনা খুলবেন না। আঁচ বন্ধ করে অন্তত ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এই সময়ের মধ্যে কুকারের ভিতরের তাপ ও বাষ্পে মাংস এবং আলু আরও ভালভাবে সেদ্ধ হবে। ঝোলের স্বাদও মাংস ও আলুর মধ্যে সুন্দরভাবে মিশে যাবে। তার পর ঢাকনা খুললেই পাওয়া যাবে লালচে, হালকা এবং সুগন্ধি খাসির ঝোল। উপরে আলাদা করে গরমমশলা ছড়ানোর প্রয়োজন নেই। কারণ এই রান্নায় মশলার গন্ধ নয়, মাংসের স্বাদটাই প্রধান।
গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের পাশে এক টুকরো বড় আলু, দু’টুকরো মাংস এবং অনেকটা পাতলা ঝোল ঢেলে পরিবেশন করুন। প্রথম গ্রাস মুখে দিলেই হয়তো ফিরে আসবে সেই রবিবার দুপুর, বাড়িভরা মানুষ আর হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার স্বাদ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)