এই সরকারের পাশেও দাঁড়াব না, বিরুদ্ধেও দাঁড়াব না: টোটা
রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে শিল্পীদের চুপ থাকা নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কেউ বলেন, তাঁরা সুবিধাবাদী। কেউ আবার মনে করেন, পেশাগত নিরাপত্তার জন্যই অনেকেই চুপ থাকেন। টোটা রায়চৌধুরী এই বিতর্ককে একেবারেই অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাঁর মতে, বিষয়টা এত সরল নয়।
রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে শিল্পীদের চুপ থাকা নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কেউ বলেন, তাঁরা সুবিধাবাদী। কেউ আবার মনে করেন, পেশাগত নিরাপত্তার জন্যই অনেকেই চুপ থাকেন। টোটা রায়চৌধুরী (Tota Roy Choudhury,)এই বিতর্ককে একেবারেই অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাঁর মতে, বিষয়টা এত সরল নয়।
তিনি মনে করিয়ে দেন, এখন এমন এক সময়ে আমরা বাস করছি, যখন শুধু ভারত বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলার মূল্য দিতে হয়। যে কোনও বিরুদ্ধ মতামত মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। সমাজে যেন ধীরে ধীরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার চেয়ে পরিচয়ের রাজনীতি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
টোটার কথায়, একসময় মতের অমিল থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেত না। রাজনৈতিক বিরোধ মানেই ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। এখন পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। একটি মাত্র বিরুদ্ধ মন্তব্য করলেই মানুষকে একটি তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই তকমার ভার নিয়ে তারপর তাকে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত দুই ক্ষেত্রেই লড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী হয়তো সত্যিই কথা বলতে চান। কিন্তু তাঁদেরও সংসার আছে, পরিবার আছে, কাজের দায়িত্ব আছে। একজন শিল্পী যদি একটি বক্তব্যের জন্য কাজ হারান, তাহলে তাঁর হয়ে দাঁড়াবে কে?
এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছেও নেই। বরং তিনি তাঁদের নীরবতার জন্য সমালোচনা না করারই পরামর্শ দেন।
তাঁর ভাষায়, একজন শিল্পী যদি চুপ করে থাকেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁর কোনও মত নেই। অনেক সময় সেই নীরবতার পিছনে থাকে বেঁচে থাকার বাস্তবতা। তবে নিজের ক্ষেত্রে তিনি অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করছেন। নিজের ভাষায়, আর হয়তো দশ-বারো বছর ক্যামেরার সামনে কাজ করবেন। তাই তিনি অন্তত নিজের মনের কথা বলতে ভয় পান না। হাসতে হাসতেই বলেন, “মরার আগে মরব না, এটা ঠিক করে রেখেছি।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন টোটা রায়চৌধুরীর ব্যক্তিত্ব ধরা পড়ে। আপসহীন, কিন্তু অহংকারী নন। নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিজেই নিতে প্রস্তুত। তবে আশ্চর্যের বিষয়, এত স্পষ্ট মতামত থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কোনও রাজনৈতিক শিবিরের মানুষ হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষকে একত্রিত করা, বিভাজন নয়। এই কারণেই তিনি অতীতের কোনও সরকারকে সমর্থন করেননি, বর্তমান সরকারের পক্ষেও দাঁড়াবেন না। আবার বিরোধিতার রাজনীতিও করবেন না।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আগের সরকারের পাশেও দাঁড়াইনি, বিরুদ্ধেও দাঁড়াইনি। এই সরকারের পাশেও দাঁড়াব না, বিরুদ্ধেও দাঁড়াব না। আমি আমার নিরপেক্ষতা বজায় রাখব। কারণ আমি শিল্পী। আমার কাজ মানুষকে একত্রিত করা, বিভাজিত করা নয়।”
আজকের রাজনৈতিক আবহে এই অবস্থান অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু টোটার কাছে এটিই শিল্পীর নৈতিক অবস্থান। এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ। নতুন সরকার আসার পর বাংলা ছবির বাজারে যেন আবার কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। একের পর এক নতুন ছবির ঘোষণা হচ্ছে। প্রযোজকেরা নতুন করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। টোটার কাছেও প্রচুর কাজের প্রস্তাব আসছে।
অনেকে মনে করছেন, সরকারের পরিবর্তনের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখানেও তিনি তড়িঘড়ি কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চান না। তিনি স্বীকার করেন, পরিবর্তনের পর থেকেই কাজের সংখ্যা বেড়েছে। নতুন ছবির প্রস্তাবও আগের তুলনায় অনেক বেশি আসছে। কিন্তু এর পিছনে শুধুই সরকার পরিবর্তন দায়ী কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
সময়ের উপরই তিনি সেই উত্তর ছেড়ে দিতে চান। কারণ তাঁর নিজের জীবনেও এমন একটি দীর্ঘ সময় কেটেছে, যখন তিনি প্রায় কোনও কাজই পাননি। অনেক ক্ষেত্রে তিনি প্রথম পছন্দ ছিলেন না। অন্য অভিনেতারা কোনও কারণে করতে না পারলে তবেই তাঁর কাছে কাজ এসেছে।
প্রায় সাত বছর ধরে এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবে সেই সময়ের জন্যও তিনি কোনও সরকারের উপর দায় চাপাতে রাজি নন। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, অভিনয়জীবনে ওঠাপড়া থাকবেই। কোনও শিল্পীর জীবনে সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করা ঠিক নয়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)