ভয়াবহ হড়পা বান নতুন নয়, ভূমিকম্প থেকে একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বারবার কেন ছারখার হচ্ছে নেপাল?

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের নেপথ্যে হিমবাহ গলে যাওয়া, ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিকাঠামোর ভূমিকা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাড়ছে ভারতের গণ্ডক নদীর জলস্তরের ঝুঁকি। কিন্তু কেন বারবার নেপাল?

Aug 27, 2026 - 12:08
0 0
ভয়াবহ হড়পা বান নতুন নয়, ভূমিকম্প থেকে একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বারবার কেন ছারখার হচ্ছে নেপাল?

কেবল প্রবল বৃষ্টি নয়। হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি, গলতে থাকা হিমবাহ এবং নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার মতো একাধিক কারণে বুধবার ভয়াবহ হড়পা বানের (Nepal Flash Flood) সাক্ষী থাকল নেপাল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভেসে যায় বসতি, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের সব কিছু। তিব্বত সীমান্তের কাছে ভোটে কোশী নদী থেকে নেমে আসা জলের স্রোত পরে ত্রিশূলী নদীতে মিশে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১৫৭ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। নিখোঁজ প্রায় শতাধিক।

২৬ অগস্ট সকাল ৯টা নাগাদ নেপালের রাসুওয়া জেলায় আচমকাই নদীতে জলের পরিমাণ বেড়ে যায়। তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় প্রথম ধাক্কা লাগে। রাসুওয়াঘাড়ি সীমান্তের সেতু-সহ একাধিক গ্রাম জলে তোরে ভেসে যায়। এরপর সেই জল নেমে আসে ত্রিশূলীর দিকে।

কীভাবে এত জল একসঙ্গে নেমে এল, তা নিয়ে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন বিশেষজ্ঞরা। নেপালের বিদেশমন্ত্রী সংসদে দাবি করেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের একটি ভূমিকম্পের পরে বড় ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে যায়। পরে সেই বাধ ভেঙে জল নেমে আসে নীচে।

তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা পরে জানায়, ভূমিকম্প নয়, একটি ভূমিধসই ওই কম্পনের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, হিমবিজ্ঞানীদের একটি অংশের ধারণা, লেন্দে খোলার উপরে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নেমে নদী আটকে দিয়েছিল। পিছনে জল জমে যাওয়ার পর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙেই বিপর্যয় ঘটেছে।

নেপালে নতুন নয় এমন ঘটনা

এই ধরনের ঘটনা নেপালে নতুন নয়। ২০২৫ সালেও একই সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ১৯৮১ সালেও তিব্বতের একটি হিমবাহ-হ্রদ আচমকা জল ছেড়ে দিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছিল এমনই। গবেষণায় সেই ঘটনায় ২০০-র বেশি মানুষের মৃত্যুর উল্লেখ রয়েছে।

বিপদের আরেকটি বড় কারণ হিমবাহ গলতে থাকা (Glacier Melt)। ২০০০ সালের পর হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ কমে যাওয়া বা গলে যাওয়ার হার দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে পাহাড়ের উপরে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ। এই হ্রদগুলির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তে নীচের দিকে নেমে আসতে পারে বিপুল জলরাশি।

নেপাল, তিব্বত ও ভারতের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে এমন হাজার হাজার হিমবাহ-হ্রদ। ২০২০ সালের একটি সমীক্ষায় কোশী, গণ্ডক ও কর্ণালী অববাহিকায় ৩,৬২৪টি হ্রদের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছিলেন গবেষকরা।

সমস্যা আরও বাড়ছে নদীর পাড়ে বিপুল নির্মাণকাজে। চিন-নেপাল বাণিজ্যপথে সেতু, রাস্তা, শুল্ককেন্দ্র, ভবন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে এমন এলাকাতেও, যেখানে হড়পা বানের ঝুঁকি রয়েছে। বুধবারের বানে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতায়ও বড় ধাক্কা লাগল। গায়েব হয়ে গেছে একাধিক প্রকল্পের প্রায় সমস্ত কিছু।

আর এই বিপদের প্রভাব শুধু নেপালেই থেমে থাকবে না বলে আশঙ্কা ভূবিজ্ঞানীদের। ত্রিশূলী থেকে জল নেমে যায় নারায়ণীতে। পরে সেই নদী ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে গণ্ডকে নামে। ফলে হিমালয়ের উপরে নজরদারি ও আগাম সতর্কতা না বাড়ালে আগামী দিনে এই বিপর্যয়ের প্রভাব আরও দূর পর্যন্ত ছড়ানোর আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User