মহালয়াতেই ইডেনে মেগা শো! আগমনীর মহা আয়োজনে শুভেন্দু সরকার, থাকতে পারেন প্রধানমন্ত্রীও
সরকারি সূত্রে খবর, মহালয়ার এই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য দরপত্র ডাকার প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। সব কিছু পরিকল্পনামাফিক চললে আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেন্সে হবে সেই মেগা অনুষ্ঠান।
রাজনৈতিক পালাবদলের পরে বাংলার প্রথম দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026)। স্বাভাবিকভাবেই এ বছরের পুজো ঘিরে আগ্রহের পাশাপাশি নানা মহলে কিছুটা সংশয়ও তৈরি হয়েছে। সেই আবহেই এবার মহালয়ার (Mahalaya) দিন কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে (Eden Gardens) নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Sevendu Adhikari) সরকার। নবান্নের শীর্ষ সূত্রের দাবি, বাংলার দুর্গাপুজোকে বিশ্বের সামনে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরাই হবে এই মেগা শোয়ের মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি সূত্রে খবর, মহালয়ার এই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য দরপত্র ডাকার প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। সব কিছু পরিকল্পনামাফিক চললে আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেন্সে হবে সেই মেগা অনুষ্ঠান।
প্রতি বছর দুর্গাপুজোর শেষে কলকাতায় রেড রোডে পুজো কার্নিভালের আয়োজন করা হয়। সেখানে শহরের নির্বাচিত প্রতিমা ও পুজো কমিটিগুলি অংশ নেয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকার এ বার শুধু বিসর্জন-পরবর্তী কার্নিভালের মধ্যে উৎসবের প্রচার সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। বরং সরকারের শীর্ষ এক নেতার কথায়, কার্নিভাল ছিল সরকার পোষিত কিছু পুজোকে নিয়ে ভাঙা পুজোর হাট। তা গোটা রাজ্যের মানুষকে স্পর্শ করত না।
নবান্নের পরিকল্পনা, মহালয়ার দিন থেকেই গোটা রাজ্যে পুজোর আবহকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরা। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার দিনটিকেই তাই বেছে নেওয়া হয়েছে।
মহালয়া বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় তিথি নয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, তর্পণ এবং দেবীর আগমনী বার্তা—সব মিলিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে দিনটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই আবেগকে কেন্দ্র করেই ইডেনে আলো, সঙ্গীত, নৃত্য এবং বাংলার লোকসংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি বৃহৎ উপস্থাপনার ভাবনা রয়েছে।
কী থাকতে পারে ইডেনের অনুষ্ঠানে
অনুষ্ঠানের রূপরেখা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে সরকারি সূত্রের দাবি, বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস, দেবীর আগমনী, বিভিন্ন জেলার লোকসংস্কৃতি, ঢাক, ধুনুচি নাচ, ছৌ এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারাকে একটি সুবিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে আনার পরিকল্পনা চলছে।
শুধু কলকাতার শিল্পীরাই নন, রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক শিল্পী ও ঢাকিকে এই অনুষ্ঠানে যুক্ত করা হতে পারে। একই সাজে এবং একই ছন্দে কয়েক হাজার শিল্পীর সমবেত পরিবেশনার কথাও ভাবা হচ্ছে।
নবান্নের এক শীর্ষ সূত্রের কথায়, আয়োজনের ব্যাপ্তি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, যাতে তা গোটা দেশের নজর কাড়ে। অনুষ্ঠানটি বিভিন্ন ডিজিটাল ও সম্প্রচার মাধ্যমে দেখানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারের অংশ হিসেবেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
লক্ষ্য কি অসমের রেকর্ডকেও ছাপিয়ে যাওয়া?
ইডেনের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় অসমের মেগা বিহু উৎসবের মডেলও আলোচনায় রয়েছে বলে খবর। ২০২৩ সালের ১৩ ও ১৪ এপ্রিল গুয়াহাটির সরুসজাই স্টেডিয়ামে অসম সরকার একটি বিশাল বিহু নৃত্য ও ঢোলবাদনের আয়োজন করেছিল।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকারের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে হাজার হাজার শিল্পী একই সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১১,৩০৪ জন নৃত্যশিল্পী ও বাদ্যযন্ত্রী সমবেত বিহু পরিবেশনায় যোগ দেন। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের (Guinness World Records) চূড়ান্ত নথিতে বৃহত্তম বিহু নৃত্যে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১১,২৯৮ বলে উল্লেখ রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ২,৫৪৮ জন ঢোলবাদক একসঙ্গে পরিবেশন করে আরও একটি রেকর্ড গড়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে অসম সরকারের হাতে রেকর্ডের শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। অসমের সংস্কৃতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সেই অনুষ্ঠান বড় সাফল্য পেয়েছিল।
নবান্ন সূত্রের দাবি, বাংলার অনুষ্ঠানটির ব্যাপ্তিও এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা রয়েছে, যা অসমের আয়োজনকে ছাপিয়ে যেতে পারে। তবে ইডেনের অনুষ্ঠানে গিনেজ রেকর্ড গড়ার আনুষ্ঠানিক চেষ্টা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও সরকারের তরফে কোনও ঘোষণা করা হয়নি।
কেন ইডেন গার্ডেন্স
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইডেন গার্ডেন্স শুধু দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ক্রিকেট মাঠ নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও পরিচিত একটি জায়গা। বিপুল দর্শক ধারণের ক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিশ্বজোড়া পরিচিতির কারণেই মেগা শোয়ের সম্ভাব্য মঞ্চ হিসেবে ইডেনকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে ক্রিকেটের মরশুম, মাঠের সুরক্ষা, সিএবি-র সম্মতি এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থার মতো একাধিক বিষয় রয়েছে। ফলে অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে রাজ্য সরকারকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
পুজোর অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখাও লক্ষ্য
রাজনৈতিক পালাবদলের পরে কলকাতা ও শহরতলির বেশ কয়েকটি বড় পুজোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এত দিন এই পুজোগুলির অনেকগুলির সঙ্গে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী কিংবা জনপ্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পরে তাঁদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। ফলে সংশ্লিষ্ট পুজোগুলির বাজেট, থিম ও আয়োজন আগের মতো থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কিন্তু দুর্গাপুজোর আয়োজন ঝিমিয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুজোকে ঘিরে প্রতিমাশিল্পী, আলোকশিল্পী, মণ্ডপ নির্মাতা, ঢাকি, পোশাক ব্যবসায়ী, পরিবহণকর্মী, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিজ্ঞাপন, খুচরো বাজার এবং পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে।
বিভিন্ন সমীক্ষা ও বাণিজ্যিক হিসাব অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর সময় বাংলায় সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্র মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে পারে। তাই উৎসবের প্রাণবন্ত চরিত্র বজায় রাখা সরকারের কাছেও একটি বড় অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
‘বাংলায় পুজো করতে দেওয়া হয় না’ অভিযোগেরও জবাব?
বিরোধী দলে থাকার সময়ে বিজেপি বারবার অভিযোগ করেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলায় দুর্গাপুজো ও হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও বিভিন্ন সময়ে বাংলার নির্বাচনী প্রচারে এই অভিযোগ তুলেছিলেন।
ক্ষমতায় আসার পরে শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সামনে তাই দুর্গাপুজোকে আরও বৃহৎ আকারে আয়োজনের রাজনৈতিক দায়ও রয়েছে। ইডেনে মহালয়ার মেগা শোয়ের মাধ্যমে নতুন সরকার একদিকে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে পুজো নিয়ে বিজেপির পুরনো রাজনৈতিক বার্তাকেও প্রশাসনিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে চাইছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
কলকাতাকে গ্লোবাল পুজো ডেস্টিনেশন করার ভাবনা
কলকাতার দুর্গাপুজো ইতিমধ্যেই UNESCO-র ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা, সেই আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গকে পুজোর সময়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা।
মহালয়ার মেগা অনুষ্ঠান সফল হলে পুজোর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের নজর কলকাতার দিকে ঘোরানো সম্ভব হবে। এর ফলে হোটেল, বিমান পরিষেবা, রেল, পরিবহণ, খাদ্য এবং খুচরো ব্যবসায় অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হতে পারে।
ইডেনে শেষ পর্যন্ত কতজন শিল্পী অংশ নেবেন, অনুষ্ঠানের মূল থিম কী হবে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকবেন কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে নবান্নের প্রস্তুতি থেকে স্পষ্ট, রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলার প্রথম দুর্গাপুজোকে কোনও ভাবেই ম্লান হতে দিতে চাইছে না শুভেন্দু সরকার। বরং মহালয়া থেকেই এমন এক উৎসবের সূচনা করতে চাইছে, যার দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা দেশ—সম্ভব হলে বিশ্বও।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)