২২ হাজার কোটির ঋণ, সাড়ে ৬ কোটি মেটালেই মাফ! জি-র সুভাষ চন্দ্রকে ছাড় দেওয়ায় জোর বিতর্ক
দেনার পরিমাণ ২২ হাজার ৬ কোটি টাকারও বেশি। অথচ সেই বিপুল ঋণের বিনিময়ে ঋণদাতারা ফেরত পেতে পারেন মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা! অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা পাওনার বিপরীতে তাঁদের হাতে আসবে মাত্র ৩ পয়সা। জি গোষ্ঠীর (Zee Group) প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের (Subhash Chandra) দেউলিয়া মামলায় এমনই একটি ঋণ পরিশোধের প্রস্তাবে সায় দিয়েছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (NCLT)।
দেনার পরিমাণ ২২ হাজার ৬ কোটি টাকারও বেশি। অথচ সেই বিপুল ঋণের বিনিময়ে ঋণদাতারা ফেরত পেতে পারেন মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা! অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা পাওনার বিপরীতে তাঁদের হাতে আসবে মাত্র ৩ পয়সা। জি গোষ্ঠীর (Zee Group) প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের (Subhash Chandra) দেউলিয়া মামলায় এমনই একটি ঋণ পরিশোধের প্রস্তাবে সায় দিয়েছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (NCLT)। সাধারণ মধ্যবিত্তের একটা ইএমআই মিস হলে যখন ব্যাঙ্ক থেকে মুহূর্মুহু ফোন আসে, তখন দেশের কোনও প্রথম সারির শিল্পপতির দেউলিয়া মামলায় এত বিপুল অঙ্কের ছাড় নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঘটনা হল, এনসিএলটি-র প্রস্তাব কার্যকর হলে ঋণদাতাদের প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ ‘হেয়ারকাট’ মেনে নিতে হবে। অর্থাৎ, তাঁদের স্বীকৃত পাওনার প্রায় পুরোটাই অনাদায়ী থেকে যাবে।
তবে এনসিএলটি-র বক্তব্য, ঋণদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যখন এই ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছেন, তখন তাঁদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের জায়গায় ট্রাইব্যুনাল নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে পারে না।
কী ছিল সুভাষ চন্দ্রের প্রস্তাব
সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ঋণদাতাদের মোট ২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার দাবি স্বীকৃত হয়েছিল। তাঁর পেশ করা ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনায় সেই বিপুল পাওনার বিরুদ্ধে প্রায় ৬.৫ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়।
হিসাব বলছে, ঋণদাতারা প্রতি ১০০ টাকা পাওনার বিনিময়ে মাত্র ৩ পয়সার কাছাকাছি ফেরত পাবেন। তাঁদের বাকি প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ পাওনা কার্যত বাদ চলে যাবে।
এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল কয়েকটি ঋণদাতা সংস্থা। তার মধ্যে ছিল এলআইসি হাউজিং ফিনান্সও (LIC Housing Finance)। সুভাষ চন্দ্রের কাছে সংস্থাটির স্বীকৃত পাওনা প্রায় ১,৩২২.৩৯ কোটি টাকা। কিন্তু প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় তাদের পাওয়ার কথা মাত্র ৩৮ লক্ষ টাকার মতো।
এলআইসি হাউজিং (LIC Housing Finance) প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব এবং বেআইনি’ বলে দাবি করেছিল। অন্য কয়েকজন ঋণদাতাও প্রশ্ন তুলেছিলেন, সাড়ে ৬ কোটি টাকার অঙ্কটি চূড়ান্ত নয়, কেবল সম্ভাব্য হিসাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তা হলে NCLT কেন অনুমোদন দিল?
ঋণদাতাদের একাংশ তীব্র আপত্তি জানালেও ভোটের অঙ্ক সুভাষ চন্দ্রের প্রস্তাবের পক্ষেই ছিল। মোট ভোটাধিকারের ৮০.৮১ শতাংশ প্রতিনিধি ঋণদাতারা এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিলেন। বিরোধীদের সম্মিলিত ভোটাধিকার ছিল ২০ শতাংশেরও কম।
NCLT-র দুই সদস্যের বেঞ্চে বিষয়টি নিয়ে দু’রকম মত তৈরি হয়েছিল। তার পর NCLT সভাপতি মামলাটি তৃতীয় সদস্য নীলেশ শর্মার কাছে পাঠান। ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপসি কোডের ১১৪ নম্বর ধারায় তিনি ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনাটি অনুমোদন করেন।
ট্রাইব্যুনালের মতে, পরিকল্পনাটি আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে থাকলে ঋণদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করা যায় না। কত টাকা ফেরত পাওয়া বাণিজ্যিকভাবে আদর্শ, তা ঠিক করা ট্রাইব্যুনালের কাজ নয়। তার ভূমিকা মূলত তদারকির।
বাকি প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার কী হবে
বাকি ২২ হাজার কোটি টাকার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যায়ন করে ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আর্থিক সম্পদের মূল্য প্রস্তাবিত সাড়ে ৬ কোটি টাকার থেকেও অনেক কম। শুধু তা নয়, এনসিএলটি-র মতে, সুভাষ চন্দ্রকে ব্যক্তিগতভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করা হলে ঋণদাতারা আরও কম টাকা ফেরত পেতে পারেন। তাই ট্রাইব্যুনালের সামনে প্রশ্ন ছিল, সাড়ে ৬ কোটি টাকা ২২ হাজার কোটি টাকার তুলনায় কতটা কম, শুধু তা নয়। বরং প্রস্তাবটি খারিজ করলে ঋণদাতারা ৬ কোটি টাকাও ফেরত পাবেন কি না, সেটিই ছিল মূল বিচার্য বিষয়।
মামলার সূত্রপাত ঘটে, বিবেক ইনফ্রাকন (Vivek Infracon) নামে একটি সংস্থার নেওয়া ঋণ থেকে। সংস্থাটির ১৭০ কোটি টাকার ঋণের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দিয়েছিলেন সুভাষ চন্দ্র। ঋণটি অনাদায়ী হয়ে যাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করে ইন্ডিয়া বুলস হাউজিং ফিনান্স (Indiabulls Housing Finance)।
২০২২ সালে সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেউলিয়ার মামলা দায়ের করে ঋণদাতা সংস্থা। ২০২৪ সালের এপ্রিলে NCLT তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেউলিয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন গ্রহণ করে। ইন্ডিয়া বুলস হাউজিং এর পর নাম বদলে সম্মান ক্যাপিটাল হয়।
এর আগে একবার সমঝোতার চেষ্টা হলেও তা কার্যকর হয়নি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট IBC-র সংশ্লিষ্ট ধারাগুলির বৈধতা বহাল রাখার পরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রক্রিয়াটি ফের এগোয়।
‘ভুল নজির তৈরি হতে পারে’, মত বিশেষজ্ঞের
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ৯৯ শতাংশের বেশি ‘হেয়ারকাট’-সহ কোনও ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনাকে কেবল ঋণদাতাদের ‘বাণিজ্যিক প্রজ্ঞা’ বলে মেনে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত দেউলিয়ার অন্য মামলাগুলিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, NCLT-র বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ ঋণদাতাদের সিদ্ধান্ত আইনবিরোধী না হলে ট্রাইব্যুনাল নিজের বাণিজ্যিক মূল্যায়ন দিয়ে সেটি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। অনুমোদিত পরিকল্পনা কার্যকর হলে যারা এর বিরোধিতা করেছিল, সেই ঋণদাতাদের উপরেও তা প্রযোজ্য হবে। মামলাটি এবার মূল ডিভিশন বেঞ্চে ফিরবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সেই বেঞ্চের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করার কথা।
সুভাষ চন্দ্রের কাছে এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত দেউলিয়ার প্রক্রিয়ায় বড় স্বস্তি। কিন্তু ঋণদাতাদের জন্য অঙ্কটি রীতিমতো কঠিন—২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার স্বীকৃত দাবির বিপরীতে ফেরত মিলতে পারে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা পাওনায় মাত্র ৩ পয়সা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)