ইঁদুরের মতো 'ক্ষুদ্র' ডাইনোসর কেবল কল্পনাতেই কেন রয়ে গেল? উত্তর মিলল কোটি বছরের ধাঁধার
ইঁদুরের মতো ক্ষুদ্র ডাইনোসর কেন ছিল না? ২৩ কোটি বছরের বিবর্তনের রহস্য উন্মোচন করল নতুন গবেষণা। জানুন বিজ্ঞানীদের চমকপ্রদ ব্যাখ্যা।
আকাশছোঁয়া দানবাকৃতি ডাইনোসরের কথা কমবেশি সবারই জানা। ১০০ ফুট লম্বা কিংবা ৯০ টনের আর্জেনটিনোসরসের (Argentinosaurus) মত বিশাল সব প্রাণী একসময় দাপিয়ে বেড়াত এই পৃথিবীতে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ইঁদুর বা খুদে পাখির মতো পিচ্চি কোনো ডাইনোসর কেন ছিল না? প্রাক-ঐতিহাসিক যুগের এই এক রহস্যের জট খুললেন একদল গবেষক।
সম্প্রতি ‘ইভোলিউশন’ (Evolution) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় গবেষকরা গণিত এবং বিবর্তনীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এর কারণ জানার চেষ্টা করেছেন। গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দৈহিক আকারের বিবর্তন পরীক্ষা করে দেখা গেছে— স্তন্যপায়ী, উড়তে সক্ষম পাখি কিংবা কাচ্ছপের শরীরের শক্তি উৎপাদন এবং শারীরিক কার্যকলাপ (Fungible energetics and physiology) দিয়ে তাদের আকারের কারণ ব্যাখ্যা করা গেলেও, কোনো ক্ষুদ্র ডাইনোসরের অস্তিত্ব না থাকার রহস্যটি এতে ধরা দেয়নি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, আসল খেলাটা ছিল পরিবেশগত আধিপত্যের (Ecological Niches)। ডাইনোসরদের আবির্ভাবের আগে থেকেই ছাঁছুঁচো আকারের খুদে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ক্ষুদ্র আকারের নানা জীবনযাত্রায় নিজেদের পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছিল। ফলে তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় না পেরে ডাইনোসরদের পক্ষে আর অত ক্ষুদ্র শরীরে বিবর্তিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

গবেষণার সহ-নেতা তথা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্টিফেনি লেচকি জানান, সাধারণত যেকোনো ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনধারণে কম সম্পদ লাগে এবং তারা খুব দ্রুত প্রজননে সক্ষম হয়। ফলে বেশিরভাগ প্রাণীগোষ্ঠীতেই ছোট আকারের সদস্যদের প্রাধান্য বেশি থাকে। অথচ জীবাশ্মের রেকর্ড বলছে, পরিচিত সবচেয়ে ছোট ডাইনোসরগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘মাইক্রোরেপ্টর’ (Microraptor)-এর ওজন ছিল ৪৩০ গ্রাম, ‘ফ্রুটাডেন্স’ (Fruitadens)-এর ৭৩০ গ্রাম এবং ‘অ্যাঙ্কিয়র্নিস’ (Anchiornis)-এর ৫৩০ গ্রাম। যা আজকের দিনের ক্ষুদ্রতম পাখি ‘বি হামিংবার্ড’ (১.৭৫ গ্রাম), স্তন্যপায়ী ‘ইট্রুস্কান শ্রু’ (১.৮ গ্রাম) কিংবা ‘বামন গেকো’ টিকটিকির (০.১৫ গ্রাম) তুলনায় অনেক বড়।
গবেষণার অপর সহ-নেতা তথা আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির কিউরেটর রজার বেনসন বলেন, বর্তমানের প্রায় ৯০ শতাংশ পাখি এবং ৭৫ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীই আকারে অনেক ছোট। ইঁদুর, বাদুড়, ছোট পাখি বা ব্যাঙের মতো ক্ষুদ্র প্রজাতিরা প্রকৃতির অধিকাংশ ছোট ছোট ফাঁকা স্থান বা 'নিশ' দখল করে রেখেছে। কিন্তু প্রাচীন ডাইনোসরদের জন্য এই বিশাল দরজাজাটাই যেন বন্ধ ছিল।
প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আসা ডাইনোসররা যখন রাজত্ব করছিল, তখন ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা পোকা-মাকড় ও বীজ খেয়ে নিজেদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলে। স্টিফেনি লেচকির মতে, আকার ছোট রেখে স্তন্যপায়ীরা যেভাবে টিকে ছিল, তাতে ডাইনোসররা খুদে রূপ নিতে পারেনি। আবার ঠিক একইভাবে বিশাল আকারের ডাইনোসরদের ভয়ে স্তন্যপায়ী প্রাণীরাও তখন বিশাল চেহারার হতে পারেনি। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসররা বিলুপ্ত হওয়ার পর অবশেষে স্তন্যপায়ীরা বড় আকার ধারণের সুযোগ পায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, অতি ক্ষুদ্র ডাইনোসর হয়তো ছিল কিন্তু তাদের কোনো জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি? গবেষকরা বলছেন এই সম্ভাবনা খুব কম, কারণ যেসব স্থানে ডাইনোসরের জীবাশ্ম মেলে সেখানে অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণীর জীবাশ্মও চমৎকারভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
বিবর্তনের ইতিহাসে পাখির আগমন অবশ্য এই সমীকরণকে কিছুটা বদলে দেয়। প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে ডাইনোসর থেকেই পাখির বিবর্তন ঘটেছিল। রজার বেনসনের মতে, উড়ার ক্ষমতা অর্জনের পর পাখিরা এই পরিবেশগত প্রতিযোগিতা থেকে রেহাই পায় এবং খুব দ্রুত ছোট আকারে মানিয়ে নেয়। সেই বিবর্তনের ফলেই আজ বিশ্বে ১২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির পাখির বৈচিত্র্য দেখা যায়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)