পুজোর ভিড় সামলাতে কোমর বাঁধছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, বাড়ছে টয়ট্রেনের রাইড
পুজোর মরশুমে পাহাড়ে পর্যটকের ঢল নামার আগেই পরিষেবা জোরদারে কোমর বাঁধছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর)। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে বড়দিন পেরিয়ে নতুন বছর—টানা প্রায় তিন মাস পাহাড়ে পর্যটনের ব্যস্ত মরশুম।
পুজোর মরশুমে পাহাড়ে পর্যটকের ঢল নামার আগেই পরিষেবা জোরদারে কোমর বাঁধছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর)। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে বড়দিন পেরিয়ে নতুন বছর—টানা প্রায় তিন মাস পাহাড়ে পর্যটনের ব্যস্ত মরশুম। আর এই সময়েই দার্জিলিংয়ের ঐতিহ্যবাহী টয়ট্রেনের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই বাড়তি চাপের কথা মাথায় রেখে নিয়মিত পরিষেবার পাশাপাশি অতিরিক্ত রাইড চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জয় রাইড এবং চার্টার্ড টয়ট্রেনের চাহিদা মেটাতেও প্রস্তুতি শুরু করেছে ডিএইচআর কর্তৃপক্ষ।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—পাহাড়ে পর্যটনের ক্ষেত্রে এই তিন মাসকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। পুজোর ছুটিতে সমতল থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক দার্জিলিং, কার্শিয়াং-সহ পাহাড়ের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় করেন। পর্যটকদের বড় অংশেরই পছন্দের তালিকায় থাকে শতাব্দীপ্রাচীন টয়ট্রেনে সফর। ফলে এই সময় নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি জয় রাইডের চাহিদাও বাড়ে। অনেক পর্যটক আবার পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য চার্টার্ড টয়ট্রেন বুক করতে আগ্রহী হন। এই বাড়তি চাহিদা সামলাতেই পরিষেবা বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে ডিএইচআর।
ডিএইচআর সূত্রে খবর, ব্যস্ত মরশুমে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু ট্রেনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, পরিষেবা যাতে মাঝপথে কোনও কারণে ব্যাহত না হয়, তার জন্য পরিকাঠামোর দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। টয়ট্রেনের ইঞ্জিন, কামরা, রেললাইন, সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন স্টেশনের পরিকাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। লক্ষ্য একটাই—পর্যটনের মরশুমে যাত্রীদের চাপ বাড়লেও পরিষেবার মানে যেন কোনও ঘাটতি না থাকে।
ডিএইচআর-এর ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরী জানিয়েছেন, পুজো থেকে নিউ ইয়ার পর্যন্ত অতিরিক্ত রাইডের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি চার্টার্ড টয়ট্রেন নিয়েও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। সেই কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও নিয়মিতভাবে কাজ করছেন। ব্যস্ত মরশুমে কোনও যান্ত্রিক বা পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে পরিষেবা যাতে থমকে না যায়, সে বিষয়েই বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
তবে পাহাড়ি রেলপথে পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা সবসময়ই সহজ নয়। বর্ষাকালে পাহাড়ে ধস, পাথর গড়িয়ে পড়া, অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক সমস্যা দেখা যায়। ফলে বর্ষার পর পুজোর মরশুম শুরু হওয়ার আগে রেললাইন এবং সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো আরও একবার খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকির জায়গাগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করা হচ্ছে বলে ডিএইচআর সূত্রে জানা গিয়েছে।
পর্যটনের ব্যস্ত মরশুমের প্রস্তুতির পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য ডিএইচআর-এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকেও আধুনিক করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কার্শিয়াংয়ে একটি বিশ্বমানের হেরিটেজ রেল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে রেলমন্ত্রক। প্রস্তাবিত এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শুধু টয়ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাই নয়, রেলের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের প্রশিক্ষণেও নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই রেলপথকে আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনেও ডিএইচআরের পরিকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ এগোচ্ছে। সেখানে ডিএইচআরের জন্য পৃথক একটি বড় ভবন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ওই ভবন থেকে পর্যটকদের জন্য একাধিক পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের তথ্য, পরিষেবা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা একই জায়গা থেকে দেওয়ার মাধ্যমে যাত্রী অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে রেলের।
শুধু নিউ জলপাইগুড়ি নয়, ধাপে ধাপে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের অন্যান্য স্টেশনগুলির পরিকাঠামোও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আধুনিকীকরণের এই প্রক্রিয়ায় টয়ট্রেনের ঐতিহাসিক চরিত্রে কোনওভাবেই আঘাত করতে চাইছে না ডিএইচআর। বরং ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ দার্জিলিংয়ের টয়ট্রেন শুধুমাত্র একটি যাত্রীবাহী রেল পরিষেবা নয়, পাহাড়ের পর্যটন ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
তাই স্টেশন সংস্কার থেকে শুরু করে নতুন পরিকাঠামো তৈরি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই হেরিটেজের চরিত্র বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। স্টেশন বা অন্য কোনও পরিকাঠামোয় পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে হেরিটেজ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। আধুনিক পরিষেবা এবং ঐতিহাসিক কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোতে চাইছে রেল কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে, সামনে পুজোর মরশুমে বাড়তি পর্যটকের চাপ সামলানোর জন্য যেমন স্বল্পমেয়াদি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে টয়ট্রেন পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করার কাজও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত রাইড, জয় রাইড ও চার্টার্ড পরিষেবা বাড়ানোর পাশাপাশি ইঞ্জিন-কামরা থেকে রেললাইন এবং স্টেশন—সব ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)