NRC ছাড়া সেন্সাস নয় - পথে নেমে মেইতেই-নাগাদের হুংকার, উল্টো সুর কুকি ফ্রন্টে! দ্বন্দ্বে তপ্ত মণিপুর

ইম্ফল উপত্যকার মেইতেই সম্প্রদায়ের মূল আশঙ্কা হল - পাশের দেশ মায়ানমার থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনুপ্রবেশ ঘটছে। ফলে এনআরসি ছাড়া সাধারণ গণনা হলে মণিপুরের আসল ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাস নষ্ট হয়ে যাবে এবং বহিরাগতরা নাগরিকের স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। নাগা অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকাগুলিতেও এই আশঙ্কার আংশিক সমর্থন মিলছে। কিন্তু কুকি অধ্যুষিত এলাকায় এই এনআরসির দাবিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করা হচ্ছে।

Aug 25, 2026 - 19:03
0 0
NRC ছাড়া সেন্সাস নয় - পথে নেমে মেইতেই-নাগাদের হুংকার, উল্টো সুর কুকি ফ্রন্টে! দ্বন্দ্বে তপ্ত মণিপুর

জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি (NRC) আপডেট না করে কেন্দ্র সরকার সরাসরি জন গণনা বা সেন্সাস (Census) শুরু করতে চাইছে - এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মণিপুর (Manipur NRC Census Protest)। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজ্যের মেইতেই এবং নাগা জনগোষ্ঠী। তাদের পরিষ্কার বক্তব্য, এনআরসি ছাড়া কোনওভাবেই গণনার কাজ চালানো যাবে না (Manipur Census 2027 controversy)। অন্যদিকে, ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে কুকি-জো কাউন্সিল (KZC)। ফলে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে (Meitei vs Kuki NRC dispute) জর্জরিত উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যে আবারও সংঘাত ও অস্থিরতার মেঘ ঘনিয়ে আসছে।

রবিবার রাত থেকেই উপত্যকাজুড়ে এনআরসির দাবিতে আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। রাজ্যের মহিলা আন্দোলনকারী গোষ্ঠী ‘মেইরা পাইবি’ এবং স্থানীয় একাধিক সংগঠন রাত নামতেই উপত্যকার মোড়ে মোড়ে মশাল মিছিল বের করে। স্লোগানে কেঁপে ওঠে চারপাশ।

সূত্র মারফত জানা গেছে, থাংমেইবান্দ সানা কেইথেলের কাছে মাপাম, বাবু বাজার, কংবা বাজার, তেন্থা এবং কোয়াকেইথেল বাজার থেকে কেইশামপাত পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তায় বিশাল মিছিল বের হয়। বাবু বাজারে বিক্ষোভকারীরা থৌবাল বাজারের দিকে পদযাত্রা করেন। কংবা বাজারের মিছিলে নেতৃত্ব দেয় একেআরইউসিও (AKRUCO), অন্যদিকে তেন্থা অপুনবা লুপ আলাদা কর্মসূচির আয়োজন করে। কেইশামথং কেন্দ্র মেইরা পাইবি দলবল নিয়ে মশাল হাতে কেইশামপাতের দিকে এগোয়

কাকচিং জেলার তোকপাচেং এলাকাতেও প্রতিবাদের আঁচ পৌঁছয়। অল তোকপাচেং ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, মেইরা পাইবি খুনাই কানবা লুপ সহ বেশ কিছু স্থানীয় ক্লাব, সংগঠন এবং ছাত্র সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এক বিশাল মশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট দাবি, এনআরসি আপডেট না করা এবং হিংসার কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষগুলোকে নিজ নিজ ভিটেমাটিতে সসম্মানে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত গৃহ তালিকা ও জন গণনার সমস্ত কাজ অবিলম্বে স্থগিত রাখতে হবে। বিক্ষোভকারীদের মতে, বহুকাল ধরে যাঁরা মণিপুরে বসবাস করছেন, একমাত্র তাদেরই এই গণনায় অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার রয়েছে।

অল তোকপাচেং ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মেইরা পাইবি সম্পাদক সেলাম ওংবি দুকানচাওবি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এনআরসি ছাড়া সেন্সাস করা নিয়ে এলাকাবাসী চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জোর করে গণনাকর্মী পাঠানো হলে এবং পরিস্থিতি জটিল হলে, তার সমস্ত দায়দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

রবিবার রাতের এই মশাল মিছিল হঠাৎ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে ‘ক্যাম্পেইন ফর জাস্ট অ্যান্ড ফেয়ার ডিলিমিটেশন’ (JFD)-এর ডাকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারি কার্যালয়গুলিতে ৪৮ ঘণ্টার বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। শনিবারেও ইম্ফল পশ্চিমের কেইশামপাত জংশনে প্রায় ২ হাজার মহিলা মশাল হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন।

গত ২২ অগস্ট জেএফডি-র স্বেচ্ছাসেবকরা উপত্যকার বিভিন্ন সরকারি দফতরে তালা ঝুলিয়ে দেন, যদিও জরুরি পরিষেবাকে এই কর্মসূচির আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। লিলং নগর পঞ্চায়েত অফিস, থামবালখং ও আন্দ্রো পার্কিংয়ের সিজিএসটি (CGST) অফিস এবং ওয়াইখং-এর এসডিও (SDO) অফিসে তালা ঝোলানোর খবর মেলে। এর আগের দিন বিষ্ণুপুরের ডিসি অফিস এবং বেশ কিছু ব্যাঙ্কেও একইভাবে তালা দেওয়া হয়েছিল।

আন্দোলনের আঁচ পড়েছে শিক্ষাঙ্গনেও। ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান বিক্ষোভ, ধর্না ও র‍্যালি বের করছে। থৌবাল ডিসি কমপ্লেক্সের আওতাধীন একাধিক দফতর, নাবার্ড (NABARD), সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক এবং ইম্ফল পশ্চিমের এমএসএলআরএম (MSLRM) দফতরের সামনেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। পাশাপাশি দু’দিনের সাধারণ ধর্মঘটের জেরে উপত্যকার স্বাভাবিক জনজীবন অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে।

জেএফডি-র ছাত্র সহ-আহ্বায়ক ডেনিল ইয়ুমলেমবাম শিক্ষা দফতরের আচরণের তীব্র সমালোচনা করে প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হলেও, সেন্সাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না কেন? পাশাপাশি, জেএফডি আহ্বায়ক জিতেন্দ্র নিংওম্বামের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর যাতে কোনও ধরনের পুলিশি নির্যাতন না হয়, সে বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেন তিনি।

এনআরসি সম্পন্নের পরেই সেন্সাস করার এই দাবি রাজনৈতিক স্তরেও ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং প্রকাশ্যে এই দাবিকে সমর্থন করেছেন। এমনকি মণিপুরের বিজেপি বিধায়কদের একটি প্রতিনিধি দল বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরতে বর্তমানে নয়া দিল্লিতে রয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন তারা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং সহ একাধিক শীর্ষ নেতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অসন্তোষ আরও বড় আন্দোলনের রূপ নিতে পারে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ১০ জন সদস্যকে নিয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধি দলও দিল্লিতে শীর্ষ নেতৃত্বের দরবারে দরবার করছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মণিপুরে ‘জনসংখ্যা গণনা ২০২৭’-এর প্রথম ধাপ অর্থাৎ ‘হাউস লিস্টিং অ্যান্ড হাউজিং সেন্সাস’ হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৩ সালেও যখন রাজ্য সরকার এনআরসি চালু করার কথা ভেবেছিল, ঠিক তখনই মণিপুরে ভয়াবহ জাতিগত হিংসা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।

তবে মেইতেই ও নাগাদের এই দাবির সঙ্গে একেবারেই সহমত নয় কুকি সম্প্রদায়। কুকি-জো কাউন্সিল (KZC) এনআরসি করার এই দাবিকে ‘অপরিণত এবং অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

মণিপুরের জাতিগত সংঘর্ষের সময় কুকি সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিন্যাস নিয়ে যে নানা "অপপ্রচার ও ভুয়ো তথ্য" ছড়ানো হয়েছে, তা খণ্ডন করতে একটি নিরপেক্ষ সেন্সাস অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে কাউন্সিল। কুকি-জো কাউন্সিলের মতে, ধারণার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সঠিক ও যাচাই করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নতুন আসন পুনর্বিন্যাস (Delimitation) হওয়া উচিত।

এনআরসি প্রসঙ্গে কাউন্সিলের সাফ বক্তব্য, এটি একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রক্রিয়া। কোনও একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা রাজ্য সরকার একা সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কোনও রাজ্যে জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে না। মেইতেইদের এই এনআরসির দাবি মূলত কুকি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আনা একতরফা অভিযোগ ও অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এক বিবৃতিতে কুকি-জো কাউন্সিল স্পষ্ট জানিয়েছে, "২০২৭ সালের সেন্সাস শেষ হওয়া এবং তার ফলাফল প্রকাশের আগে এনআরসি-র দাবি তোলা একেবারেই ভিত্তিহীন ও অহেতুক।" অসম এনআরসির জটিল প্রশাসনিক ও আইনি অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা সতর্ক করেছে যে, মণিপুরে এমন পদক্ষেপের পরিণাম কতটা মারাত্মক হতে পারে তা ভেবে দেখা দরকার। কেন্দ্র সরকারকে এই সেন্সাস নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।

কী এই এনআরসি এবং কেন এই সংঘাত? সহজ কথায়, এনআরসি (National Register of Citizens) হল ভারতের বৈধ নাগরিকদের এক সরকারি নথি। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের ১৪এ (Section 14A) ধারা অনুযায়ী কেন্দ্র সরকার বাধ্যতামূলকভাবে দেশের নাগরিকদের নাম নথিভুক্ত করে এই রেজিস্টার তৈরি করতে পারে। ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব নিয়মে এর রূপরেখা স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে, সেন্সাস বা সাধারণ জন গণনা এবং এনআরসি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়া। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে আসামে যে এনআরসি হয়েছিল, তা আজও কেন্দ্র সরকার চূড়ান্তভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি (Notify) করে অনুমোদন দেয়নি।

ইম্ফল উপত্যকার মেইতেই সম্প্রদায়ের মূল আশঙ্কা হল - পাশের দেশ মায়ানমার থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনুপ্রবেশ ঘটছে। ফলে এনআরসি ছাড়া সাধারণ গণনা হলে মণিপুরের আসল ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাস নষ্ট হয়ে যাবে এবং বহিরাগতরা নাগরিকের স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। নাগা অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকাগুলিতেও এই আশঙ্কার আংশিক সমর্থন মিলছে। কিন্তু কুকি অধ্যুষিত এলাকায় এই এনআরসির দাবিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করা হচ্ছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User